ট্রাম্পকে হত্যার হুমকিতে ইরানকে সতর্কতা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তাকে হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র এমন মাত্রার সামরিক হামলা চালাবে, যা এর আগে বিশ্ব কখনও দেখেনি। তিনি জানান, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে কীভাবে জবাব দিতে হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আগেই নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন।
নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ট্রাম্পকে হত্যার হুমকিতে ইরানকে সতর্কতা জানিয়ে তিনি আগে থেকেই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘যদি আমার সঙ্গে কোনো কিছু ঘটে, তাহলে তাদের ওপর এমন মাত্রায় বোমা হামলা চালাতে হবে, যা তারা আগে কখনও দেখেনি।’
গত মঙ্গলবার ও বুধবার এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে সবচেয়ে বড় ধরনের হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায় তেহরান। এরপর হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। ওয়াশিংটন এ ঘটনাকে যুদ্ধবিরতি-পরবর্তী সমঝোতা লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছে।
শুক্রবার পর্যন্ত নতুন করে বড় ধরনের কোনো হামলার খবর পাওয়া না গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। এ সময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল ট্রাম্পকে ইরানের নতুন একটি হত্যাচক্রান্তের বিষয়ে সতর্ক করেছে।
তবে ট্রাম্প বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চাননি। তিনি বলেন, ইসরায়েল এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পায়নি এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। তাই এ ধরনের হুমকি তার কাছে নতুন নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তা গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। সিএনএনকে দেওয়া বক্তব্যে তারা বলেছেন, ইসরায়েল হয়তো ট্রাম্পকে আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে।
উত্তেজনা আরও বাড়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরুতে নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির দাফন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। দাফনে অংশ নেওয়া কিছু মানুষ ট্রাম্পের মৃত্যুর প্রতিশোধ দাবি করে ব্যানার প্রদর্শন করেন। একটি ব্যানারে ট্রাম্পের মাথাকে বন্দুকের নিশানায় দেখিয়ে ‘রক্তপাত হবে’ লেখা ছিল।
নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে সম্প্রতি ট্রাম্পের সফর পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনা হয়। প্রেসিডেন্টের জন্য নির্ধারিত নতুন কাতারি উড়োজাহাজে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ না থাকায় ন্যাটো সম্মেলন শেষে তাকে পুরোনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ উড়োজাহাজে ফিরে আসতে হয়।
ট্রাম্পকে হত্যার হুমকিতে ইরানকে সতর্কতা প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন, ইরান ট্রাম্পকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করেছে। গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল জুরি আসিফ মার্চেন্টকে দোষী সাব্যস্ত করে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে যোগাযোগ থাকা মার্চেন্ট ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এসে ট্রাম্পকে হত্যার উদ্দেশ্যে একজন ভাড়াটে খুনি নিয়োগের চেষ্টা করেছিলেন।
ওই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর তৎকালীন বাইডেন প্রশাসন তেহরানকে সতর্ক করে জানায়, ট্রাম্পকে হত্যা করা হলে সেটিকে সরাসরি যুদ্ধের কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
অন্যদিকে, গত বুধবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, জুন মাসে ইরানের সঙ্গে হওয়া ‘সমঝোতা স্মারক’ কার্যত আর কার্যকর নেই। যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে কঠোর ভাষায় তিনি ইরানকে ‘একটি ক্যানসার’ বলেও মন্তব্য করেন।
তবে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। শুক্রবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ ট্রাম্প লেখেন, ইরান আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও তাতে সম্মত হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
এদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে শুক্রবার কাতারের মধ্যস্থতায় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে। কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

