প্রধান খবর

জুলাই শহীদ ছেলের অনুদানের টাকায় বাবা আনলেন নতুন বউ

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনের বাবা মোহাম্মদ আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনের প্রথম সারির এক শহীদের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই, সরকারের দেওয়া অনুদানের অর্থ ব্যবহার করে প্রায় সোয়া পাঁচ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার কিনে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন তার প্রথম স্ত্রী ও স্থানীয়রা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপজেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের কুমড়াশসন গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল মতিন (৫০) ঢাকার মতিঝিলে আলফা গ্রুপের একটি শাখায় সেলস ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। দীর্ঘ ২২ বছরের দাম্পত্য জীবনে তার প্রথম স্ত্রী মমতাজ বেগমের (৪৫) কোল আলো করে জন্ম নেয় একমাত্র ছেলে শাহরিয়ার। গত বছরের ১৮ জুলাই ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন শাহরিয়ার এবং ২০ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শাহাদাতবরণ করেন। এছাড়া এই দম্পতির ১০ বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, একমাত্র সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই আব্দুল মতিন প্রথম স্ত্রীর অমতে প্রায় সোয়া পাঁচ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার এবং ৭ লাখ টাকার কাবিনে দ্বিতীয় বিয়ে সম্পন্ন করেন। এই খবর জানার পর গত ২ জুন লোকলজ্জা ও ক্ষোভে নিজের ১০ বছরের কন্যাসন্তানকে নিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন মা মমতাজ বেগম। পরে পরিবারের অন্য সদস্যরা টের পেয়ে তাদের নিবৃত্ত করেন।

শহীদ শাহরিয়ারের মা মমতাজ বেগম অশ্রুসজল চোখে অভিযোগ করেন, “সন্তান হারানোর শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এর মধ্যেই আমার অনুমতি ছাড়াই আব্দুল মতিন বংশ রক্ষার অজুহাত দেখিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তার নিজের উপার্জনে এত দামি গহনা কেনা অসম্ভব। আমার শহীদ ছেলের রক্তের ওপর ভর করে, অনুদানের টাকায় তিনি এই কাজ করেছেন।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, শহীদ পরিবারের জন্য বরাদ্দকৃত ৩০ লাখ টাকা উত্তোলনের জন্য আব্দুল মতিন তার স্বাক্ষর জাল করারও চেষ্টা করেছিলেন এবং ছেলের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদ আব্দুল মতিন। তার দাবি, “বংশ রক্ষার স্বার্থে এবং মায়ের অনুরোধে প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নিয়েই আমি দ্বিতীয় বিয়ে করেছি। আমি চাকরি করি এবং বিয়ে করার মতো আর্থিক সামর্থ্য আমার রয়েছে। ছেলের অনুদানের টাকা ব্যবহারের অভিযোগটি ভিত্তিহীন।”

এদিকে এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। আন্দোলনের ময়মনসিংহ জেলার সমন্বয়ক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, “একজন জুলাই শহীদের বাবা হিসেবে মতিন সাহেবের এমন সিদ্ধান্ত আমাদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। শহীদ পরিবারের প্রতি মানুষের যে সম্মান ও আবেগ রয়েছে, এই পদক্ষেপ তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।” এছাড়া আন্দোলনের কেন্দ্রীয় শহীদ ও আহত সেলের সমন্বয়কারী আল নূর আয়াত এবং স্থানীয় ছাত্রনেতারা জানান, একজন শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া সম্মান এভাবে ক্ষুণ্ন করা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *