লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে এক মর্মান্তিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এক ঘাতকের নির্মম কোপে প্রাণ হারিয়েছেন এক জননী এবং তাঁর তিন কন্যা। মাত্র সাত বছর আগে পিতাকে হারানো আঠারো বছর বয়সী তরুণ জুনায়েদ ইসলাম সিফাত এখন এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে পুরোপুরি অভিভাবকহীন ও একা। চোখের পলকে একটি সাজানো পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহতরা হলেন— সিফাতের মা শাহিনুর বেগম (৩৮), বড় বোন সায়মা আক্তার (২১), মেজো বোন ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট বোন শিফা আক্তার (৯)। অন্যদিকে, নৃশংস এই ঘটনা ঘটানোর পর পালাবার সময় স্থানীয়দের গণপিটুনিতে অভিযুক্ত ঘাতক অন্তর মজুমদার (২৮) নামের এক যুবকও নিহত হয়েছেন। নিহত অন্তর নোয়াখালীর সুবর্ণচর এলাকার কার্তিক মজুমদারের ছেলে এবং পেশায় রায়পুর বাজারের একজন ভ্রাম্যমাণ ফল ব্যবসায়ী ছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে থেকে জানা যায়, সিফাতদের আদি বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায় হলেও জীবিকার সন্ধানে ১০-১২ বছর আগে তাঁর বাবা মো. কামাল হোসেন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে আসেন। রায়পুরের দেনায়েতপুর এলাকায় ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে একটি ভাড়া বাসায় সন্তানদের নিয়ে বসবাস শুরু করেন তিনি। সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার এক বুক স্বপ্ন নিয়ে দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতেন এই হকার বাবা। কিন্তু ২০১৯ সালে এক বর্ষণমুখর দিনে হাড়ি-পাতিল ও সিলভার সামগ্রী নিয়ে গ্রামে ফেরি করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিনি মারা যান।
বাবার অকালমৃত্যুর পর মা ও বোনদের মুখের দিকে চেয়ে এবং নিজের লেখাপড়া সচল রাখতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাত্র ৮ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন রায়পুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী সিফাত। প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার সকালেও তিনি কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই তাঁর সাজানো পৃথিবীটা এক লহমায় তছনছ হয়ে যায়।
স্বজন হারানোর তীব্র যন্ত্রণায় হাউমাউ করে কেঁদে উঠে সিফাত বলেন, “আমার মা আর বোনদের কী অপরাধ ছিল? কেন তাদেরকে এভাবে কেটে ফেলা হলো? আমি এখন কাকে নিয়ে বাঁচব? দুনিয়াতে তো আমার আর কেউ রইল না!”
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটনে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবু তারেক ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন। তিনি प्रत्यक्षদর্শী ও বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলে জানান, ঘাতক অন্তর আগে তাঁর স্ত্রীসহ এই বাসাতেই ভাড়া থাকতেন। প্রায় ৭-৮ মাস আগে তিনি বাসাটি ছেড়ে চলে যান। ধারণা করা হচ্ছে, পূর্বপরিচিত হওয়ার সুবাদে সকালে তিনি ওই বাসায় প্রবেশ করেন এবং এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটান।
পুলিশ সুপার আরও জানান, রাণী নামের এক প্রতিবেশী অন্তরকে ওই বাসায় দেখে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি পানির পাইপ মেরামত করার অজুহাত দেখান। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ওই প্রতিবেশী বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বাইরে থেকে কলাপসিবল গেটটি আটকে দিয়ে স্থানীয়দের খবর দেন। এই সাহসী পদক্ষেপের কারণেই ঘাতক অবরুদ্ধ হয় এবং মূল ঘটনা দ্রুত প্রকাশ পায়। তবে ঠিক কী কারণে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

