প্রধান খবর

শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে ইসরায়েল, ফিলিস্তিনে চলছে পরিকল্পিত

গাজা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর ইসরায়েলের ইচ্ছাকৃত ও ধারাবাহিক হামলা মূলত তাদের চলমান গণহত্যারই একটি অংশ। জাতিসংঘের একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। কমিশন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ইসরায়েল অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের হত্যা ও নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে; যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গাজায় গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল।

প্রতিবেদনে প্রাপ্ত প্রমাণ অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালের ঐতিহাসিক ‘গণহত্যা কনভেনশন’-এর অধীনে থাকা পাঁচটি নিষিদ্ধ কাজের মধ্যে চারটি অপরাধই ইসরায়েল সরাসরি সংঘটিত করেছে। যার মধ্যে রয়েছে- ফিলিস্তিনিদের হত্যা, গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিসাধন, ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি এবং তাদের বংশবৃদ্ধি রোধ করা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় নিহতদের প্রায় ৩০ শতাংশই অবুঝ শিশু। জাতিসংঘের শিশু সংস্থা (ইউনিসেফ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বর হামলায় এ পর্যন্ত ৫০,০০০-এরও বেশি শিশু নিহত বা পঙ্গু হয়েছে। এমনকি ২০২৫ সালের অক্টোবরে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় দীর্ঘ আট মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন গড়ে একজন করে ফিলিস্তিনি শিশু প্রাণ হারিয়েছে।

ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর এই অমানবিক হামলার প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ। ইসরায়েল কর্তৃক গাজার নবজাতক ও প্রসূতি সেবা কেন্দ্রগুলোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করায় গর্ভপাত, জন্মগত ত্রুটি এবং শিশুদের দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক দুর্বলতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের প্রজনন ভবিষ্যৎ এবং নবজাতকদের বেঁচে থাকাকে সরাসরি বিপন্ন করে তোলা হচ্ছে। একই সাথে ইসরায়েলের চরম সাহায্য অবরোধের কারণে গাজায় অনাহারজনিত মৃত্যু ঘটেছে এবং টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় শিশুদের মধ্যে নানা মরণব্যাধির প্রকোপ মারাত্মকভাবে বেড়েছে। গাজা ছাড়াও অধিকৃত পশ্চিম তীরে এতিমখানা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশকে সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

নিহত বা আহত হওয়ার পাশাপাশি ফিলিস্তিনি শিশুরা ব্যাপক আকারে গ্রেপ্তার ও অমানবিক আটকের সম্মুখীন হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ইসরায়েলি কারাগারে আটক শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই বন্দি রয়েছে। সেখানে তাদের ওপর নির্মম শারীরিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নসহ নানা গুরুতর দুর্ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মানবিক সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় এই শিশুরা বর্তমানে আরও বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।

জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরালিধর এ বিষয়ে বলেন, “শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ইসরায়েল মূলত ফিলিস্তিনি জনগণের অস্তিত্ব রক্ষা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সক্ষমতার ওপরই চূড়ান্ত আঘাত হানছে। গাজা ও পশ্চিম তীরে বোমা ও বন্দুকের শব্দ থমকে গেলেও ফিলিস্তিনি শিশুরা রাতারাতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারবে না।”

জাতিসংঘের এই বিশেষ কমিশন শিশুদের ওপর হামলার জন্য দায়ী নির্দিষ্ট ইসরায়েলি সামরিক ইউনিটগুলোকে চিহ্নিত করেছে এবং ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে এই সহিংসতা বন্ধ করার জোর আহ্বান জানিয়েছে। তবে জেনেভায় অবস্থিত ইসরায়েলি মিশন এই প্রতিবেদনটিকে একটি “মানহানিকর প্রহসন” বলে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। বরাবরের মতোই তাদের দাবি, এই প্রতিবেদনে হামাসের কৌশলকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *