প্রধান খবর

সাবেক স্পিকার ও বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মহাপ্রয়াণ

বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র, আইন অঙ্গন ও রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, সাবেক স্পিকার ও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার আর নেই। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে রাজধানীর শ্যামলীর একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার (১২ জুলাই) ভোর ৪টা ১৯ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। প্রখ্যাত এই ব্যক্তিত্বের প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও আইন পাড়ায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর তৎকালীন জলপাইগুড়ি জেলার (বর্তমান পঞ্চগড়) তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জমির উদ্দিন সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি এলএলবি সম্পন্ন করেন। ১৯৬০ সালে আইন পেশায় যোগ দেওয়ার পর ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল ডিগ্রি লাভ করেন। দেশে ফিরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন বিষয়ে সুনামের সঙ্গে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ওকালতি করেন তিনি। তার দুই ছেলেও বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে ব্যারিস্টার হিসেবে কর্মরত আছেন।
রাজনীতির মাঠে ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয় ছিলেন এই বর্ষীয়ান নেতা। পরবর্তীতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে বিএনপি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিভিন্ন মেয়াদে ভূমি, শিক্ষা, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের ক্যারিয়ারের অন্যতম শীর্ষ সময় ছিল ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত, যখন তিনি অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সংসদ পরিচালনায় তার নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক রীতি-নীতির কঠোর অনুসরণ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। এছাড়া ২০০২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর তিনি বেশ কিছুকাল বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন।

আইন ও রাজনীতি ছাড়াও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং শিক্ষাক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। আন্তর্জাতিক আইন, সমুদ্র আইন ও জাতিসংঘ নিয়ে তিনি একাধিক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। নিজ জন্মভূমি পঞ্চগড়ে শিক্ষার আলো ছড়াতে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার কলেজিয়েট ইনস্টিটিউট’। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী বেগম নুর আখতার, এক মেয়ে ও দুই ছেলেসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ও আইনি কাঠামোর উন্নয়নে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *