প্রধান খবর

বদলে যাচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চিত্র, ট্রাম্পের নতুন সিদ্ধান্তে আকাশযুদ্ধে নতুন সমীকরণ

বদলে যাচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চিত্র। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং রোবটনির্ভর যুদ্ধ এখন সংঘাতের নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এর মধ্যেই ইউক্রেনকে নিজ দেশে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির লাইসেন্স দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের মতে, এ সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের যুদ্ধের কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।

গত বুধবার তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির অধিকার দেওয়া হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র এ প্রযুক্তি ব্যবহারের পদ্ধতিও শেখাবে। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের বিদ্যমান প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত থেকে কোনো ইউনিট সরবরাহ করবে না। পাশাপাশি ইউক্রেনে উৎপাদন কবে শুরু হবে, সে বিষয়েও তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা উল্লেখ করেননি।

জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিন মনে করেন, স্বল্পমেয়াদে এ সিদ্ধান্তের প্রভাব সীমিত হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পেলে ইউক্রেন নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক প্রতিরক্ষা কর্মসূচি দ্রুত এগিয়ে নিতে পারবে। তার ধারণা, তুলনামূলক কম ব্যয়ের ক্ষেপণাস্ত্রও অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

প্যাট্রিয়ট শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র নয়; এটি একটি সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এতে থাকে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র, শক্তিশালী রাডার, মোবাইল লঞ্চার এবং কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। এসব একসঙ্গে কাজ করে শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান প্রতিহত করে।

এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রেও দ্রুত বদলে যাচ্ছে কৌশল। রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষই এখন ড্রোননির্ভর অভিযানে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ইউক্রেনের একটি নজরদারি ড্রোন খারকিভ অঞ্চলে বনাঞ্চলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক রুশ সেনাকে শনাক্ত করে। পরে বিস্ফোরকবোঝাই কামিকাজে ড্রোন পাঠিয়ে তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়।

বর্তমানে রাশিয়া বড় বাহিনীর পরিবর্তে দুই বা তিন সদস্যের ছোট অনুপ্রবেশকারী দল ব্যবহার করছে। কারণ বড় দল সহজেই ড্রোনের নজরদারিতে ধরা পড়ছে। অপরদিকে ইউক্রেনীয় ইউনিট কমান্ডাররা একই সময়ে ২০ থেকে ৩০টি ড্রোনের ভিডিও পর্যবেক্ষণ করে যুদ্ধক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের মতে, প্রচলিত ‘ফ্রন্টলাইন’-এর ধারণা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের সামরিক বিশ্লেষক পাভেল লুজিন বলেন, বর্তমান সংঘাত দ্রুত ‘নেটওয়ার্ককেন্দ্রিক যুদ্ধে’ রূপ নিচ্ছে। এতে সেনা, কমান্ডার, ড্রোন ও অস্ত্রব্যবস্থা রিয়েল-টাইমে সংযুক্ত থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও হামলা পরিচালনা অনেক বেশি কার্যকর হচ্ছে।

জনবল সংকট মোকাবিলায় ইউক্রেন এখন স্থলভিত্তিক রোবটের ব্যবহারও বাড়িয়েছে। এসব রোবট বাঙ্কার ধ্বংস, গোলাবারুদ পরিবহন, আহত সেনাদের উদ্ধার এবং মেশিনগান পরিচালনার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। পশ্চিম ইউক্রেনের রোবোটিক কমপ্লেক্সেস কোম্পানির প্রধান ইহোর চাইকিভস্কি বলেন, সেনাসংকটের কারণে যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের পরিবর্তে রোবট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।

এদিকে গুগলের সাবেক প্রধান নির্বাহী এরিক শ্মিটের কোম্পানি সুইফট বিটের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ‘হরনেট’ ড্রোনও ব্যবহার করছে ইউক্রেন। এই ড্রোন শত্রুপক্ষের জ্বালানিবাহী ট্রাক, সরবরাহ যান ও সামরিক বহর শনাক্ত করতে পারে এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের মধ্যেও কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম।

এক ইউক্রেনীয় ড্রোন অপারেটর বলেন, ভবিষ্যতে শত্রু সেনা শনাক্ত করার কাজও পুরোপুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা করবে। মানুষের চোখ এড়িয়ে গেলেও এআই শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করতে পারবে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার পরিবর্তে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে বেশি জোর দিয়েছে। ফলে বিশাল ভৌগোলিক এলাকাজুড়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। ইউক্রেনের সাবেক সেনা কর্মকর্তা ইহোর রোমানেঙ্কোর মতে, বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করতে পারছে না।

সাম্প্রতিক হামলায় ইউক্রেনীয় ড্রোন সাইবেরিয়ার ওমস্কে রাশিয়ার বৃহত্তম তেল শোধনাগারের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। একই সময়ে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, চলমান যুদ্ধের ভাগ্য অনেকটাই আকাশযুদ্ধের ওপর নির্ভর করছে এবং ইউক্রেন এখন সেই প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

তবে ইউক্রেনের সাবেক সেনাপ্রধান ও বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ভ্যালেরি জালুঝনি সতর্ক করে বলেছেন, শুধুমাত্র ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কোনো পক্ষকে চূড়ান্ত বিজয় এনে দিতে পারবে না। তার মতে, আধুনিক যুদ্ধ এখন প্রযুক্তিনির্ভর হলেও কৌশলগত বিজয়ের জন্য সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত অগ্রগতি প্রয়োজন।

এদিকে শুক্রবার ভোরে রাশিয়ার ৬৮টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩৫১টি ড্রোন হামলায় কিয়েভ ও আশপাশে অন্তত ২৭ জন নিহত হন। হামলায় বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বেসামরিক মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আর শুধু ট্যাংক ও কামানের লড়াই নয়। এটি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সক্ষমতার প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। আর ট্রাম্পের নতুন ঘোষণা সেই পরিবর্তনের গতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *