ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতাকে কেন্দ্র করে রাজধানী তেহরান এখন এক অভূতপূর্ব শোকের সাগরে পরিণত হয়েছে। প্রিয় নেতাকে শেষ নজর দেখতে ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সের বাইরে শনিবার (৪ জুলাই) ভোররাত থেকেই হাজার হাজার মানুষ সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করছেন। স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় জনসাধারণের জন্য মোসাল্লার প্রবেশদ্বার খুলে দেওয়ার অনেক আগেই সেখানে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। তীব্র আবেগ আর চোখে জল নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে ইরানের নেতৃত্ব দেওয়া এই শীর্ষ নেতা। ওই একই হামলায় খামেনির মেয়ে, নাতনি, জামাতা ও পুত্রবধূও প্রাণ হারান। এরপর ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাত চলতে থাকায় দীর্ঘ চার মাস খামেনির দাফন অনুষ্ঠান স্থগিত রাখতে হয়েছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান একটি যুদ্ধবিরতির সুযোগে রাষ্ট্রীয়ভাবে অত্যন্ত নিখুঁত ও ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হচ্ছে।
ইরান প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খামেনির স্মরণে ইরান ও ইরাকের একাধিক শহরে সাত দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান পালিত হবে, যা গতকাল শুক্রবার থেকেই শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাতে তাঁর মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আনা হয়। শুক্রবারের মূল অনুষ্ঠানে ইরানের তিনটি প্রধান সরকারি শাখার প্রধানসহ বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিদল উপস্থিত হয়ে শহীদ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা অশ্রুসজল চোখে প্রিয় নেতার জন্য মোনাজাত করেন।
আন্তর্জাতিক এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় শুধু ইরানের মিত্ররাই নন, বরং বৈচিত্র্যময় বহু দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে খামেনির মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানান এবং পরে ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সাক্ষাৎ করেন। এছাড়াও লেবাননের হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহর পরিবারের সদস্যরা এবং ভারত থেকে আসা শিখ ও হিন্দু ধর্মীয় নেতাদের একটি বিশেষ প্রতিনিধিদলও এই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়। তবে এক ব্যতিক্রমী ও কঠোর কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে কোনো ইউরোপীয় দেশকে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায়নি তেহরান। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, খামেনির ওপর চালানো সামরিক অভিযানে যারা প্রত্যক্ষ বা
পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়েছে, তাদের এই শোকসভায় রাখার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
প্রশাসন আশা করছে, এই ঐতিহাসিক বিদায়যাত্রায় সব মিলিয়ে এক কোটিরও বেশি মানুষের সমাগম ঘটবে। তেহরানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ নেওয়া হবে শিয়া ধর্মীয় শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র কোমে। এরপর ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালা হয়ে খামেনির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে তাঁর জন্মস্থান মাশহাদে, যেখানে শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমামের মাজারের পাশে তাঁকে চিরশায়িত করা হবে।

