প্রধান খবর

পশ্চিমবঙ্গ অ্যান্টি-গুন্ডা বিল: বিচার ছাড়াই ১২ মাস আটক, বাড়ছে বিতর্ক

পশ্চিমবঙ্গে দুষ্কৃতকারী ছবি : সংগৃহীত পশ্চিমবঙ্গ অ্যান্টি-গুন্ডা বিল: বিচার ছাড়াই ১২ মাস আটক, বাড়ছে বিতর্ক

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রস্তাবিত পশ্চিমবঙ্গ অ্যান্টি-গুন্ডা বিল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও মানবাধিকার মহলে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। আইনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান অনুযায়ী, জননিরাপত্তার জন্য কোনো ব্যক্তিকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করলে তাকে বিচার বা অভিযোগপত্র ছাড়াই সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত আটক রাখার ক্ষমতা পাবে প্রশাসন। এই বিধানকে অনেক আইন বিশেষজ্ঞ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ), ১৯৮০-এর সঙ্গে তুলনা করছেন, যেখানে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার স্বার্থে একই ধরনের প্রতিরোধমূলক আটকের সুযোগ রয়েছে।

শুধু প্রতিরোধমূলক আটকের ক্ষমতাই নয়, নতুন বিলে পুলিশের তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনের আওতাভুক্ত অপরাধগুলোকে আমলযোগ্য এবং অজামিনযোগ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত অপরাধের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে।

আইনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে আটক বা কোনো এলাকা থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ জারি করা হবে, তাদের আশ্রয় দেওয়া, লুকিয়ে রাখা অথবা যেকোনো ধরনের সহযোগিতা করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

পশ্চিমবঙ্গ অ্যান্টি-গুন্ডা বিল-এ ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’-এর সংজ্ঞাও আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বা নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি, জীবন, ব্যক্তি বা সম্পদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি, জনশৃঙ্খলা বা জনশান্তি বিঘ্নিত করা, বৈধ ব্যবসা বা আইনসম্মত অধিকার প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি, কাউকে বেআইনিভাবে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ, সরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পদের বড় ধরনের ক্ষতি এবং অবৈধ খনি, পাথর বা বালু উত্তোলন, বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণী পাচারের মাধ্যমে সরকারি রাজস্বের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি—এসব কর্মকাণ্ডকে অসামাজিক কার্যকলাপের আওতায় আনা হয়েছে।

বিলে ‘গুন্ডা’ শব্দটির ব্যাখ্যাও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। একা অথবা কোনো দল, চক্র বা সিন্ডিকেটের সদস্য কিংবা নেতা হিসেবে নিয়মিত অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি, এসব কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন, সহায়তা বা উৎসাহ প্রদানকারী ব্যক্তিদেরও এই আইনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ২০২৩-এর ১১১ বা ১১২ ধারায় অভিযোগপত্রভুক্ত ব্যক্তি, অস্ত্র আইন ১৯৫৯, মাদকদ্রব্য ও মনস্তাত্ত্বিক পদার্থ আইন ১৯৮৫, অনৈতিক পাচার (প্রতিরোধ) আইন ১৯৫৬ এবং বিস্ফোরক উপাদান আইন ১৯০৮-এর আওতায় অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধেও এই আইন প্রয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। সমাজে বিপজ্জনক ও দুর্ধর্ষ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতদেরও একই শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আইনটি নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ অ্যান্টি-গুন্ডা বিল প্রশাসনের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা তুলে দিচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এই আইন রাজনৈতিক বিরোধী, সামাজিক কর্মী কিংবা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোরও দাবি, ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’-এর বিস্তৃত সংজ্ঞা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ বা নাগরিক আন্দোলনকেও আইনের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে রাজ্য সরকার। সরকারের দাবি, আইনটির উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করা নয়; বরং সংঘবদ্ধ অপরাধ, চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট কার্যক্রম এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। সরকারের ভাষ্য, আইন মেনে চলা সাধারণ নাগরিকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই এবং এই আইন শুধুমাত্র অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *