পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা চলাকালীন সশস্ত্র জঙ্গিগোষ্ঠীর আকস্মিক ও ভয়াবহ হামলায় অন্তত ৩৭ জন শিক্ষার্থী নিখোঁজ হয়েছে। গত মঙ্গলবার (৩০ জুন) দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বর্বরোচিত এই হামলার ঘটনায় একজন সেনাসদস্য এবং একজন শিক্ষকসহ অন্তত তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার বোরনো রাজ্যের লাসা শহরের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা চলাকালে এই হামলা চালায় কুখ্যাত সশস্ত্র জঙ্গিগোষ্ঠী ‘ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স’ (আইএসডব্লিউএপি)। দীর্ঘদিন ধরেই নাইজেরিয়ার এই অঞ্চলে বিভিন্ন উগ্রপন্থী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা ও সহিংসতা চলছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পরীক্ষা চলাকালীন আকস্মিকভাবে বন্দুকধারীরা ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে এবং নির্বিচারে গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে।
ঘটনার পর থেকে বিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে আসা অন্তত ৩৭ জন শিক্ষার্থীর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ২৫ জন ছাত্রী, ১১ জন ছাত্র এবং একজন শিক্ষক রয়েছেন। নাইজেরিয়ার সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হামলার পরপরই তারা তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে অন্তত ১০ জনকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া স্কুলের উপাধ্যক্ষসহ আটজনকে পরে জঙ্গিরা ছেড়ে দিলেও একজন শিক্ষক এখনও জিম্মি রয়েছেন।
স্থানীয় সরকার কাউন্সিলর ইজাগলা ইজাবিলা সাংবাদিকদের কাছে নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের একটি আনুষ্ঠানিক তালিকা সরবরাহ করেছেন, যার সত্যতা নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সূত্রগুলো। বোরনো রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী লাওয়ান আব্বা ওয়াকিলবে লাসা শহরে সাংবাদিকদের বলেন, “নিরাপত্তা বাহিনী অপহৃত শিক্ষার্থীদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধারে সর্বাত্মক চিরুনি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা পুরো পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।”
নাইজেরিয়ার সংঘাতপ্রবণ উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে মূলত বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে অপহরণ করা এখন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস ও কৌশলে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে অরক্ষিত স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রায়শই এই ধরনের বর্বরোচিত হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০১৪ সালে অন্য এক জঙ্গিগোষ্ঠী ‘বোকো হারাম’ দেশটির চিবোক শহরের একটি স্কুল থেকে প্রায় পৌনে তিনশ স্কুলছাত্রীকে অপহরণ করেছিল, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও দেশটিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে হামলা ও গণ-অপহরণের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। গত মে মাসেও বোরনো রাজ্যের মুসা গ্রাম থেকে ৪০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে অপহরণ করা হয়, যাদের অনেকেই এখনও ঘরে ফেরেনি। একই মাসে তুলনামূলক নিরাপদ হিসেবে পরিচিত ওয়ো রাজ্যের তিনটি স্কুল থেকেও কয়েক ডজন শিক্ষার্থী অপহৃত হয়।
২০০৯ সাল থেকে নাইজেরিয়ার সরকার সশস্ত্র বিদ্রোহ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে টানা লড়াই করে আসছে। বিগত এক দশকে সহিংসতার মাত্রা কিছুটা কমলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবারও লাগাতার হামলা ও গণ-অপহরণের এই হিড়িক দেশটির চরম ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সাধারণ নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

