রাশিয়ার রাজধানী মস্কো ও এর আশপাশের অঞ্চলে অভূতপূর্ব ও স্মরণকালের বৃহৎ ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। এই হামলায় মস্কোর উত্তরে অবস্থিত রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৌশলগত ‘ডুবনা স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র’ অবরুদ্ধ করাসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে ইউক্রেন। তবে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটেছে মস্কো অঞ্চলের একটি আবাসিক এলাকায়; যেখানে ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে একটি বসতবাড়ি ধসে পড়ে মাত্র ছয় মাস বয়সী এক নিষ্পাপ রুশ শিশুর নির্মম মৃত্যু হয়েছে।
সোমবার (২৯ জুন) রাত থেকে মঙ্গলবার (৩০ জুন) ভোর পর্যন্ত কয়েক দফায় রাজধানী লক্ষ্য করে এই ড্রোন হামলা চালানো হয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত এই ডুবনা কেন্দ্রটি রুশ সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং ইউক্রেন ফ্রন্টে যুদ্ধরত রুশ বাহিনীর মূল সমন্বয় পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়। এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে এটি ওই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় ইউক্রেনের দ্বিতীয় সফল আঘাত।
তবে রাশিয়া তাদের অতি-গুরুত্বপূর্ণ ডুবনা যোগাযোগ কেন্দ্র সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হওয়ার দাবিটি পুরোপুরি স্বীকার করেনি। মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিওভ জানান, ডুবনা শহরে একটি ইউক্রেনীয় ড্রোন মূলত একটি প্রশাসনিক ভবনে আঘাত হেনেছে এবং এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে তিনি অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানান, একই সময়ে মস্কো অঞ্চলে পৃথক একটি ড্রোন হামলায় একটি সাধারণ আবাসিক বাড়ি ধসে পড়ে ছয় মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারকর্মীরা দুই জন প্রাপ্তবয়স্ক ও দুটি শিশুকে জীবিত বের করে আনতে পারলেও, হাসপাতালে নেওয়ার পথেই ছোট শিশুটি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে।
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানান, রাজধানীমুখী এই ভয়াবহ ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় ছিল এবং তারা অন্তত ৬০টির বেশি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি—গত ২৪ ঘণ্টায় পুরো দেশজুড়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ইউক্রেনের মোট ৪১৯টি ড্রোন ধ্বংস বা জ্যামিংয়ের মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ মস্কো অঞ্চলের এই কাপুরুষোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ইউক্রেনের এই হামলায় সরাসরি বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অবুঝ শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার ড্রোন হামলার পরিধি ও তীব্রতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। রাশিয়ার মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তেল শোধনাগারের পাশাপাশি এখন মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো প্রধান শহরগুলোতেও বড় বড় হামলা চালানো হচ্ছে। এর আগে গত ২২ জুনও ইউক্রেন একই ডুবনা স্যাটেলাইট কেন্দ্রে হামলার দাবি করেছিল। গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন, রাশিয়াকে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে তারা বর্তমানে ৪০ দিনের একটি বিশেষ ও বিধ্বংসী সামরিক অভিযান পরিচালনা করছেন। মস্কোর বুকে এই বৃহৎ ড্রোন হামলা তারই অংশ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা।

