প্রলয়ঙ্করী জোড়া ভূমিকম্পে কাঁপছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। সময় গড়ানোর সাথে সাথে দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। সোমবার (২৯ জুন) দেশটির সরকারি খতিয়ান অনুযায়ী, এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১,৭১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। তীব্র কম্পনে আহত হয়েছেন আরও প্রায় ৫,০০০ মানুষ এবং আকস্মিক ঘরবাড়ি হারিয়ে চরম বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১২,০০০ বাসিন্দা। প্রশাসন এখনো নিখোঁজদের কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করতে না পারায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ভেনেজুয়েলায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার আবাসিক ও মানবিক সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোল্লা জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান চলাকালীন গত রোববারও অলৌকিকভাবে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৭ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কায় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যৌথভাবে ১০,০০০টি ‘বডি ব্যাগ’ (লাশ সংরক্ষণের ব্যাগ) সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভূমিকম্পে দেশটির ৭টি রাজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে উপকূলীয় লা গুয়াইরা রাজ্য এবং রাজধানী কারাকাসের ডিসট্রিটো ক্যাপিটালে। অঞ্চলগুলোতে প্রায় ২,৫০০টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে শত শত ভবন সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
বর্তমানে উপদ্রুত এলাকার পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং থমথমে। মূল ভূমিকম্পের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০টি আফটারশক বা পরবর্তী কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে সোমবার ভোরেও ৫.২ মাত্রার একটি শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। এর পাশাপাশি সাগরে সৃষ্ট একটি লঘুচাপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা উদ্ধারকাজকে আরও ব্যাহত করছে। সাধারণত অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো জীবনের লক্ষণ পাওয়া যাওয়ায় অলৌকিক কিছুর আশায় উদ্ধারকাজের সময়সীমা আরও বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ২৭টি দেশ থেকে আসা ২,০০০-এরও বেশি উদ্ধারকর্মী ১৬০টিরও বেশি সন্ধানী কুকুর সহ মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন।
ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধারকাজের পাশাপাশি তারা এখন জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়, খাদ্য সহায়তা, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছেন। গৃহহীন পরিবারগুলোর চিকিৎসা ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার জন্য লা গুয়াইরায় তিনটি বিশেষ সহায়তা কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। উদ্ধারকাজের সাথে সংশ্লিষ্ট ভ্যানেসা মে নামের এক কর্মকর্তা জানান, মানুষ তাদের সর্বস্ব হারিয়ে মানসিক স্থিতিশীলতা হারিয়ে ফেলেছে। খাদ্য বা পানির মতোই এখন মানুষের তীব্র আবেগীয় সমর্থন প্রয়োজন। স্বজনদের জন্য ধ্বংসস্তূপের পাশে অপেক্ষারত পরিবারগুলোর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ।
উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে বিশেষ সমীক্ষা চালানো হবে। এরপর শুরু হবে ধ্বংসস্তূপ অপসারণ এবং প্রাথমিক পুনরুদ্ধারের কাজ, যেখানে স্কুল ও হাসপাতাল পুনর্নির্মাণে বিশেষ নজর দেওয়া হবে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের স্থায়ী পুনর্বাসনের আগে মাটির উপযোগিতা পরীক্ষা বা ‘সয়েল সার্ভে’ করার প্রয়োজন থাকায় এই পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়া বেশ দীর্ঘমেয়াদী হবে। এই কঠিন সময়ে ভেনেজুয়েলার প্রতি বৈশ্বিক সংহতি ও মানবিক সাহায্য যেন এখনই থেমে না যায়, সেই জোর আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মহল।

