প্রধান খবর

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প : ৩২ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বেঁচে ফিরল ১৮ দিনের শিশু

দক্ষিণ আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলায় বুধবার (২৪ জুন) আঘাত হানা প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১,৪৩০ জনে দাঁড়িয়েছে। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর যখন চারদিকে আশার আলো ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একের পর এক অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা স্তব্ধ ও শোকাচ্ছন্ন জাতিকে নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস জোগাচ্ছে।

সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা শহরে টানা ৩২ ঘণ্টা যমদূতের মতো চেপে বসা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার পর ১৮ দিন বয়সী এক নবজাতককে সম্পূর্ণ অলৌকিকভাবে ও অক্ষত অবস্থায় জীবিত উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। কম্বলে মোড়ানো ওই ছোট্ট শিশুটিকে যখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বের করে আনা হচ্ছিল, তখন উপস্থিত শত শত মানুষ উল্লাস ও করতালিতে ফেটে পড়েন। অশ্রুসজল চোখে বাবা তার সন্তানকে কোলে তুলে নেওয়ার ঠিক ৯০ মিনিট পর, শিশুটির মাকেও একই স্থান থেকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। হাসপাতালে চিকিৎসকেরা জানান, ভূমিকম্পের ঠিক ওই চরম মুহূর্তে মা নিজের শরীর দিয়ে সন্তানকে আগলে রেখেছিলেন বলেই অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছে এই নবজাতকের প্রাণ।

একই শহরের আরেকটি ধসে পড়া বহুতল আবাসিক ভবন থেকে ২৪ ঘণ্টা পর চার বছর বয়সী এক শিশুকে উদ্ধার করা হয়। পরে তার বাবা-মাকেও জীবিত বের করে আনতে সমর্থ হন উদ্ধারকারীরা। দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এই অলৌকিক ঘটনাগুলোকে চরম সংকটের মধ্যেও দেশবাসীর জন্য কিছুটা স্বস্তি ও বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা বলে অবিহিত করেছেন। ভূবিজ্ঞানীদের মতে, মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে পরপর ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুটি অতি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘ডাবলেট’ বলা হয়। গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকম্পন। এর ফলে দেশটিতে ২৫০টিরও বেশি বহুতল ভবন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে এবং এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি বাসিন্দা।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘সোনালি সময়’ দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। এই ভয়াবহ মানবিক সংকটে জাতিসংঘের পাশাপাশি ব্রাজিল, কানাডা, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্ব থেকে জরুরি উদ্ধারকারী দল এবং মানবিক সহায়তা পাঠানো হয়েছে। তবে দুর্গত এলাকায় সরকারের ভারী যন্ত্রপাতির অভাব এবং ধীরগতির ত্রাণ তৎপরতা নিয়ে উপদ্রুত মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে। অনেকেই খালি হাতে স্বজনদের সন্ধান করছেন। এমনকি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গেলে ভারপ্রাপ্ত নেত্রীকে স্থানীয়দের তীব্র বিদ্রূপের মুখে পড়তে হয়।

জাতিসংঘের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই জোড়া ভূমিকম্পে সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৬৭০ কোটি মার্কিন ডলার। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তীব্র অর্থনৈতিক মন্দায় জর্জরিত দেশটিতে এই দুর্যোগ যেন ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *