প্রধান খবর

অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তব চিত্র এবং চ্যালেঞ্জ!

দেশে চলমান প্রথাগত বৈদেশিক ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে যেতে চায় আমাদের বর্তমান সরকার। মিডিয়ায় এমনটাই জানিয়েছেন দেশের সম্মানিত অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যাকে আমাদের দেশের দীর্ঘ মেয়াদি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

আসলে শুধু বিশ্ব মানের অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নের নামে উন্নয়নশীল এবং স্বল্প আয়ের একটি দেশের দীর্ঘ মেয়াদি বৈদেশিক ঋন ও দেনা ঠিক কতটা বিপদজনক হতে পারে তার এক বাস্তব উদাহরণ হলো আর্জেন্টিনা। সিইআইসি ওয়েবসাইটের দেয়া আপডেট তথ্যমতে, ২০২৫ সাল শেষে আর্জেন্টিনার মোট বৈদেশিক ঋন ও দেনার স্থিতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩২০.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুযায়ী, আর্জেন্টিনার হাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে মাত্র প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার (CEIC Data)। অথচ, একই সময়ে বৈদেশিক ঋন ও দেনার আসল ও সুদের কিস্তি পরিশোধ বাবদ বর্তমানে দেশটিকে হয়তো আনুমানিক ১০-১১ বিলিয়ন ডলার বাধ্যতামূলকভাবে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে, যা তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখাটা এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।

যদিও, সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে কঠোর আর্থিক মিতব্যয়ী নীতি (fiscal austerity) অনুসরণের কারণে ঋণ-জিডিপি অনুপাত ক্রমশ নিম্নমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে। তবে, দেশটির সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বিপরীতে বৈদেশিক ঋনের পরিমাণ এখনো কিন্তু বিপদজনক পর্যায়ে রয়ে গেছে।

আসলে, বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির চলমান অনিশ্চয়তা ও জ্বলানি সংকটের মধ্যেই বৈদেশিক ঋণ, ফরেক্স রিজার্ভ ও আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ভারসাম্য (অভার অল ব্যালেন্স অব পেমেন্ট), রেমিট্যান্স আয় উন্নয়নশীল এবং স্বল্প আয়ের একটি দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক সক্ষমতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হয়। এখানে শুধু নমিনাল জিডিপি কিংবা কল্পিত মাথাপিছু আয় দিয়ে কোনো দেশের টেকসই অর্থনৈতিক সক্ষমতা ঠিক কোন পর্যায়ে রয়েছে তা বোঝা সম্ভব নয়।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের সম্প্রতি অর্থনৈতিক হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সক্ষমতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস শেষে দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে বৈদেশিক ঋণ ও দেনার স্থিতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১১৩.৫১ বিলিয়ন ডলার।

তবে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশে রেকর্ড পরিমাণ ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে আসায় বিগত চার বছর পর আবারও ওভার অল ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বা পরিশোধে ব্যালান্স উদ্বৃত্তে ফিরেছে। যেখানে চলতি ২০২৬ সালের মার্চ মাসের ৩১ দিনে দেশে প্রবাসী কর্মীরা দেশে রেকর্ড পরিমাণ প্রায় ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। যাকে আমাদের দেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য ইতিবাচক অর্জন হিসেবে দেখা উচিত।

অন্যদিকে, বাংলাদশ ব্যাংকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৫.১০৯ বিলিয়ন ডলার এবং নেট রিজার্ভ (BPM6 অনুযায়ী) ছিল ৩০.৩৫৭ বিলিয়ন ডলার। তবে আমাদের দেশে মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতির বিপরীতে আমাদের কমপক্ষে প্রায় ৫৫–৬০ বিলিয়ন ডলারের ফরেক্স রিজার্ভ থাকা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

২০২৪–২৫ অর্থবছরে আমাদের দেশে মোট পণ্য আমদানি করা হয়েছে প্রায় ৬৪.৩৫ বিলিয়ন ডলার এবং একই সময়ে সারাবিশ্বে পন্য রপ্তানি করা হয়েছে প্রায় ৪৩.৯৬ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৭.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০.৩৯ বিলিয়ন ডলার। যদিও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৪৮.২৮ বিলিয়ন ডলারের পন্য রপ্তানি করে। ভারতের PIB ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটির বৈদেশিক ঋণ প্রায় ৭৪৬ বিলিয়ন ডলার। তবে শক্তিশালী রিজার্ভের কারণে ঋণের চাপ তুলনামূলকভাবে কম। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (স্বর্ণসহ) দাঁড়িয়েছে ৭১৬.৮১ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া, দেশটি গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারা বিশ্বে পণ্য ও সেবা রপ্তানি করে প্রায় ৮২৪.৩ বিলিয়ন ডলার।

পাকিস্তানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির মোট বৈদেশিক ঋণ ও দায়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩৮ বিলিয়ন ডলার। অথচ এর বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মাত্র ২১.৭ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাকিস্তানের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩২.১০৬ বিলিয়ন ডলার এবং একই সময়ে মোট আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৮.৩৮ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া, দেশটি গত ২০২৫ সালে মোট রেমিট্যান্স আয় করে প্রায় ৩৮.৩ বিলিয়ন ডলার।

পরিশেষে বলা যায়, একটি উন্নয়নশীল দেশের টেকসই অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে বৈদেশিক ঋনের উপর যতটা সম্ভব নির্ভরতা হ্রাস করে আমাদের নিজস্ব রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং এর পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। তাই, এক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধিতে সফল হলেও রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।

লেখা : সিরাজুর রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *