প্রধান খবর

মার্কিন যুদ্ধকৌশলের সেই চিরন্তন সত্য, যা তারা কখনো স্বীকার করে না!

বিংশ শতাব্দীর আশির দশক থেকে এখন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রায় ১৮-২০টি যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে যুদ্ধ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় দেশটির মোট ব্যয় হতে পারে হয়তো প্রায় ২-৩ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে এই বিপুল অর্থের একটি বড় অংশই কিন্তু ঘুরেফিরে আমেরিকার নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদনকারী কোম্পানি ও প্রতিরক্ষা কর্পোরেশনগুলোর পকেটে গেছে।

এছাড়া, নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করতে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে দেশটির বাইরে সারা বিশ্বে প্রায় ৭৫০ বা তার বেশি সামরিক ঘাঁটি ও কমান্ড সেন্টার পরিচালনা করছে। ধারণা করা হয়, এগুলো পরিচালনায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় শত বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়ে থাকে।

আসলে, প্রায় পাঁচ দশক ধরে বিরতিহীনভাবে ১৮-২০টি দেশের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়ালেও আমেরিকা কখনোই তার সমপর্যায়ের অথবা দ্বিতীয় স্তরের সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন কোনো দেশের
বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করেনি। কোল্ড ওয়ার যুদ্ধের সময় দুর্বল ও দরিদ্র ভিয়েতনামের কাছে পরাজয়ের পর তারা ধারাবাহিকভাবে সামরিক সক্ষমতার বিচারে তুলনামূলক দুর্বল, অস্থিতিশীল বা শক্তিহীন দেশগুলোর বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছে।

এই দীর্ঘ সময়ে আমেরিকা একের পর এক আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, ভেনিজুয়েলা ও ইরাকের মতো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করেছে। কিন্তু চীন বা রাশিয়া তো দূরের কথা, ফ্রান্স, জার্মানি বা ইতালির মতো দ্বিতীয় স্তরের সামরিক শক্তির বিরুদ্ধেও তারা কখনো সরাসরি সামরিক সংঘাতে যায়নি।

অবশেষে, অন্য কিছু দেশের প্ররোচনায় এবার আমেরিকা সরাসরি ইরানের মতো মধ্যম পর্যায়ের সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছে। মাসব্যাপী এই যুদ্ধে আমেরিকা ইরানের ওপর ভয়াবহ মিসাইল ও বিমান হামলা চালালেও, ইরানের পাল্টা আঘাত ও সামরিক প্রতিক্রিয়া ছিল চমকে দেওয়ার মতো।

সামরিক সক্ষমতার বিচারে ইরান কিন্তু জাপান, ভারত, তুরস্ক, ইতালি বা জার্মানির মতো দেশের কাতারে নেই। তাদের বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেকটাই দুর্বল। তবে, দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তির কমব্যাট ড্রোন ও ব্যালেস্টিক মিসাইলের সক্ষমতা ইতোমধ্যেই বিশ্বের সামনে প্রমাণিত। যুদ্ধে হাজার হাজার সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস হলেও ইরান এখন পর্যন্ত নিজস্ব প্রযুক্তির মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে ব্যাপক পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা (বিশেষ করে আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত) মিডিয়ায় দাবি করা হচ্ছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতার ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে ইরান যুদ্ধক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই বরং ভয়াবহ মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার বহু সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

আপাতদৃষ্টিতে এটা শুধু দুটি পক্ষের মধ্যে চলমান যুদ্ধ মনে করা হলেও বাস্তবে ইরানকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ৬-৭টি আরব দেশসহ মোট ৮-৯টি দেশের সঙ্গেও যুদ্ধ করতে হচ্ছে তাদের। অর্থাৎ ইরান থেকে কোনো মিসাইল বা ড্রোন নিক্ষেপ করলে তা ৪-৫ স্তরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছায়। এই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই ইরান যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে আছে।

পরিশেষে বলা যায়, আজ ইরান যদি নিজস্ব ড্রোন ও মিসাইলের পাশাপাশি বিমান বাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে পারত, তাহলে হয়তো আজ এই যুদ্ধের চেহারাই ভিন্ন হতো। আর এর পাশাপাশি ইরানের হাতে স্বল্প সক্ষমতার কিছু সংখ্যক পরমাণু অস্ত্র থাকলে তো এই যুদ্ধ হয়তো শুরুই হতো না। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এক নম্বর সামরিক শক্তি হলেও তারা কখনোই অধিক যোগ্য ও সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন দেশের বিরুদ্ধে কখনোই সরাসরি যুদ্ধ করতে চায় না বা জড়ায় না। আর এটাই হচ্ছে চিরন্তন এক কৌশলগত বাস্তবতা।

লেখা : সিরাজুর রহমান

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *