এক সপ্তাহের টানা ভারী বর্ষণ এবং এর ফলে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢল ও ভয়াবহ পাহাড়ধসে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের পর্যটন নগরী কক্সবাজার। গত ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই প্রলয়ঙ্কারী প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলায় এ পর্যন্ত পানিতে ডুবে এবং পাহাড়ের মাটিচাপা পড়ে ২৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে (ক্যাম্প) বসবাসকারী ১৫ জন রোহিঙ্গা নাগরিকও রয়েছেন, যা এই দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার জেলার চকরিয়ার বরইতলীতে বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ার পর নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। এর পাশাপাশি চকরিয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার পৃথক স্থানে তীব্র পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভেসে গিয়ে আরও দুই নিষ্পাপ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো জেলা জুড়ে এখন শোকের মাতম চলছে।
জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া রামু, সদর, উখিয়া ও টেকনাফের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে। মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নিম্নাঞ্চলের প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে দুর্বিষহ দিন পার করছেন।
জরুরি দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলায় ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ইতিমধ্যেই ঘরবাড়ি হারানো ১৪ হাজারের বেশি বিপন্ন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গত এলাকার মানুষের মাঝে জরুরি মানবিক সহায়তার জন্য ২০০ টন চাল, শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে দুর্গম ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে এখনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ছয় দিনে জেলায় ৭০০ মিলিমিটারের চেয়েও বেশি রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। আগামী আরও দুই দিন এই মুষলধারে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস থাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরও মারাত্মক অবনতি এবং নতুন করে পাহাড়ধসের তীব্র আশঙ্কায় স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।

