প্রধান খবর

ভেনেজুয়েলায় বিধ্বংসী ভূমিকম্পের ৮ দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার হার্নান গিল

প্রকৃতির চরম তাণ্ডবের মাঝেও মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও উদ্ধারকারীদের যৌথ প্রচেষ্টায় এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে ভেনেজুয়েলায়। গত ২৪ জুন দেশটিতে আঘাত হানা ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের দীর্ঘ ৮ দিন পর, প্রায় ১৪০ টন কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে হার্নান গিল নামের এক ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। টানা ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল এক উদ্ধার অভিযান শেষে তাঁকে অক্ষত অবস্থায় মুক্ত করতে সক্ষম হন জরুরি উদ্ধারকর্মীরা।

ভেনেজুয়েলার সেই প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৩০০ জনের প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং এখনও নিখোঁজ রয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। এমন এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে ধ্বংসস্তূপের বিশাল স্তূপের নিচ থেকে হার্নান গিলকে বের করে আনার ঘটনাকে আধুনিক উদ্ধার ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া এক চিলীয় দমকলকর্মী নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা টেনে বলেন, “এটি ছিল নিঃসন্দেহে আমার দেখা সবচেয়ে জটিল এবং প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত কঠিন একটি উদ্ধার অভিযান।”

ভূমিকম্পের মূল আঘাতের সময় হার্নান গিল একটি শপিংমল-সংলগ্ন পার্কিং এলাকার বেজমেন্টে ছোট একটি কংক্রিটের নিরাপত্তা কক্ষে ডিউটি করছিলেন। তীব্র কম্পনে পুরো ভবন ধসে পড়লেও, ওই ছোট শক্তিশালী কংক্রিটের কক্ষটি তাঁর চারপাশে একটি সুরক্ষামূলক আবরণ তৈরি করেছিল; যার ফলে ১৪০ টন ওজনের ভারী ধ্বংসস্তূপের প্রচণ্ড চাপ সরাসরি তাঁর ওপর পড়েনি।

দীর্ঘ ৮ দিন পর উদ্ধার পাওয়ার অলৌকিক মুহূর্তটির সূচনা হয়েছিল গত রবিবার। কোস্টারিকান রেড ক্রসের প্যারামেডিক অ্যালান মাদ্রিগাল প্রথম ধ্বংসস্তূপের গভীর থেকে ভেসে আসা গিলের অতি ক্ষীণ সাহায্যের আর্তনাদ শুনতে পান। মুহূর্তটি এতটাই অবিশ্বাস্য ছিল যে, মাদ্রিগাল প্রথমে নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। পরে অন্য সহকর্মীকে ডেকে নিশ্চিত হয়েই উদ্ধারকারীরা দ্রুত সুনির্দিষ্ট স্থানে খননকাজ শুরু করেন। উদ্ধার পাওয়ার পর গিলকে অক্সিজেন মাস্ক ও ঘাড়ে সাপোর্ট কলার পরিয়ে, কমলা রঙের কম্বল মুড়িয়ে যখন বের করে আনা হয়, তখন তিনি সম্পূর্ণ সচেতন ও মানসিকভাবে দৃঢ় ছিলেন।

এই আন্তর্জাতিক উদ্ধার অভিযানে ভেনেজুয়েলা, চিলি, কোস্টারিকা, এল সালভাদর, মেক্সিকো, পর্তুগাল এবং যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী দল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যৌথভাবে কাজ করেছে। গিলের কাছে পৌঁছানোর জন্য তৈরি করা সুড়ঙ্গের কিছু অংশ একাধিকবার ধসে পড়ায় উদ্ধারকর্মী ও আটকে পড়া গিল উভয়ের জীবনই বারবার সংকটে পড়েছিল। তবে সব বাধা পেরিয়ে উদ্ধারকারীরা গিলের জন্য পানি ও শিরায় তরল (ইন্ট্রাভেনাস) দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন। মেক্সিকান রেড ক্রসের সদস্য মার্কো আন্তোনিও ফ্রাঙ্কো জানান, চরম সংকটের মাঝেও গিল ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি। এমনকি তিনি উদ্ধারকারীদের উৎসাহ দিতেন এবং নিজের পছন্দের স্বাদের হাইড্রেশন ড্রিংক পানের ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন। শত শত টন ভেঙে পড়া কংক্রিটের নিচে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও গিলের এই বেঁচে ফেরা বিশ্বজুড়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মীদের নতুন আশা জুগিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *