প্রধান খবর

স্যালিউট-১: প্রথম মানুষ বসবাসযোগ্য মহাকাশ স্টেশন

বর্তমানে মহাকাশে স্থায়ীভাবে সক্রিয় রয়েছে মানবজাতির তৈরি দুটি মহাকাশ স্টেশন। যার মধ্যে রয়েছে চীনের তিয়ানগং স্পেস স্টেশন (TSS) এবং ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন (ISS)। এখানে নভোচারীরা নিয়মিত অবস্থান করেন এবং সেখানে পরিকল্পিতভাবে গবেষণামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

যদিও অতীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পাঠানো মীর মহাকাশ স্টেশনও দীর্ঘদিন মানবজাতির গর্বের প্রতীক হিসেবে টিকে ছিল। মূলত, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে পরবর্তীতে আর্থিক সংকটের মুখে রাশিয়া মীর মহাকাশ স্টেশনকে পরিকল্পিতভাবে ২৩ মার্চ, ২০০১ সালে ধ্বংস করে দেয়।

তবে, মানবজাতির ইতিহাসে প্রথম নভোচারীর বসবাসযোগ্য মহাকাশ স্টেশন ছিল স্যালিউট-১। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এটি পরীক্ষামূলকভাবে ১৯ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে সাময়িক সময়ের জন্য মহাকাশে প্রেরণ করেছিল।

স্যালিউট-১ এর ওজন ছিল প্রায় ১৮,৪২৫ কেজি এবং এটি পৃথিবীর কক্ষপথে মোট ২,৯২৯ বার প্রদক্ষিণ করে। স্যালিউট-১ পৃথিবীর লো আর্থ অরবিটে (LEO) একটানা ১৭৫ দিন অবস্থান করে এবং ১১ অক্টোবর, ১৯৭১ সালে এটিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ করানো হয় এবং ধ্বংস করা হয়।

মহাকাশে পাঠানোর পর স্যালিউট-১-এ প্রথম প্রবেশের চেষ্টা হয়েছিল Soyuz 10 মিশনে (এপ্রিল ১৯৭১), প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে নভোচারীরা এর ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। তবে এই সীমাবদ্ধতা মহাকাশ গবেষণার পথ কখনই বন্ধ করতে পারেনি।

পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ৬ জুন সোভিয়েত ইউনিয়নের পাঠানো Soyuz 11 স্পেস মিশনের মাধ্যমে তিনজন নভোচারী এর স্পেস স্টেশনে সফলভাবে প্রবেশ করেন। এই মিশনে ছিলেন সোভিয়েত মহাকাশ বিজ্ঞানী জর্জি ডোব্রোভলস্কি, ভ্লাদিস্লাভ ভলকভ এবং ভিক্টর পাটসায়েভ।

তারা সেখানে একটানা মোট ২৩ দিন অবস্থান করেন এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যান। যা সে সময়ের জন্য একটি অভাবনীয় প্রযুক্তিগত অর্জন ছিল। অথচ সমসাময়িক কালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশ গবেষণায় ব্যাপকভাবে এগিয়ে গেলেও, মহাকাশে স্পেস স্টেশন পাঠানোর প্রতিযোগিতায় যথেষ্ট পিছিয়ে ছিল।

তবে, অত্যন্ত হতাশাজনক হলেও সত্য যে, পৃথিবীতে ফেরার পথে Soyuz 11 ক্যাপসুলে অক্সিজেনের চাপ কমে যাওয়ায় সম্মানিত তিনজন নভোচারীই মারা যান। এটি মহাকাশ ইতিহাসে একমাত্র ঘটনা, যেখানে মানুষ পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে কারমান লাইনের ওপরে মৃত্যুবরণ করেন।

পরিশেষে বলা যায়, স্যালিউট-১ আধুনিক যুগের ISS-এর মতো উন্নত না হলেও এটি মানবজাতির মহাকাশ গবেষণায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এর মাধ্যমে মহাকাশে মানবজাতির পরিকল্পিত ও দীর্ঘ মেয়াদি গবেষণা এবং বসবাসের পথ উন্মুক্ত হয়।

লেখা: সিরাজুর রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *