মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন জোটের মধ্যকার সংঘাত এবার এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। পারস্য উপসাগরে মার্কিন বাহিনীর বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এবার কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে একযোগে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। আকস্মিক এই হামলার পর কুয়েত ও বাহরাইনজুড়ে সতর্কতা সাইরেন বাজানো হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উভয় দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) সক্রিয় করা হয়েছে। আজ বুধবার (১৫ জুলাই) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়েছে।
কুয়েতের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাব দিতে এবং নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সাথে দেশের জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হয়ে কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা ও সুরক্ষাবিষয়ক নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক জরুরি সতর্কবার্তায় জনগণকে শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়ে অনতিবিলম্বে নিকটতম নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, কুয়েত ও বাহরাইনে ইরানের এই হামলার কিছুক্ষণ আগেই ইরানের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিশ ও কেশম দ্বীপ লক্ষ্য করে জোরালো হামলা চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাত পৌনে ১০টার দিকে ইরানি সংবাদমাধ্যমের বরাতে আল জাজিরা এই তথ্য নিশ্চিত করে। গত তিন দিনে দ্বীপ দুটিতে বারবার হামলা চালিয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনী। কেশম দ্বীপটি ইরানের জন্য ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের যতগুলো দ্বীপ রয়েছে, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় এবং এই দ্বীপের সামরিক অবস্থান ব্যবহার করেই মূলত হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে তেহরান। ধারণা করা হয়, সেখানে ইরানের বিপুল পরিমাণ উন্নত অস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রমজুত রয়েছে, যা ধ্বংস করতেই মার্কিন বাহিনী বারবার সেখানে আঘাত হানছে।
এদিকে, পারস্য উপসাগরে চলমান এই সংঘাতের রেশ ধরে ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তেহরানকে সরাসরি ইসরায়েলে হামলা না করার বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, ইরান যদি ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা চালায়, তবে অতীতের যেকোনো সংঘাতের তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী ও কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে। ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় নেগেভ মরুভূমির ডিমোনা শহরে আয়োজিত এক সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় নেতানিয়াহু হুংকার দিয়ে বলেন, ‘সেই দিন শেষ হয়ে গেছে, যখন কেউ আমাদের আঘাত করত আর আমরা তার দ্বিগুণ শক্তিতে পাল্টা আঘাত হানতাম না।’
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে এই আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হলেও গত সপ্তাহে নতুন করে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। তবে এবারের নতুন উত্তেজনায় এখন পর্যন্ত ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কোনো হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেনি। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার প্রতিশোধ হিসেবে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকেই প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে তেহরান। মার্কিন বাহিনীর হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

