তাজমিন হত্যাকাণ্ড: কক্সবাজারে সাড়ে চার ঘণ্টা ডিবির জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কারাগারে রাজু

কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন (১৫) হত্যা মামলার তদন্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসা কক্সবাজারের হোটেলকর্মী রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজু চৌধুরী (২০)-কে সাড়ে চার ঘণ্টা ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে পুনরায় কক্সবাজার সদর মডেল থানা-পুলিশের জিম্মায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। গত সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

কক্সবাজার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাজাহান ইলাহী নূরী এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে কক্সবাজার সদর জুডিসিয়াল আদালতে রাজুকে হাজির করা হয়। এরপর বিচারক মোহাম্মদ ইরফানুল হক চৌধুরী শুনানি শেষে তাকে কারাগারে প্রেরণের আদেশ দেন। এর আগে গত রোববার রাতে কক্সবাজার শহরের কলাতলী হোটেল-মোটেল জোন এলাকার চন্দ্রিমা উদ্যানসংলগ্ন স্থান থেকে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তাকে আটক করে পুলিশ। তাজমিন হত্যায় তার সংশ্লিষ্টতার খবর গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা তাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।

পুলিশ সূত্র জানায়, সোমবার সকালে কুমিল্লা ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা ও উপ-পরিদর্শক পবিত্র সরকার রাজুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কক্সবাজার জেলা পুলিশের কাছে লিখিত অধিযাচনপত্র পাঠান। এর প্রেক্ষিতে কুমিল্লা থেকে ডিবির একটি বিশেষ দল কক্সবাজার সদর মডেল থানায় এসে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে তাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে কুমিল্লায় না এনে পুনরায় কক্সবাজার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ অহিদুর রহমান জানান, কুমিল্লা পুলিশের অধিযাচন অনুযায়ী রাজুকে তাদের মুখোমুখি করা হয়েছিল এবং জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ফেরত দেওয়ার পর বিকেলে তাকে ৫৪ ধারায় আদালতে সোপর্দ করা হয়।

এদিকে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান মুঠোফোনে জানান, রাজুকে গ্রেপ্তার করে কুমিল্লায় নিয়ে যাওয়ার জন্য পুলিশ দল কক্সবাজারে যায়নি; মূলত হোটেলে অবস্থানসহ তদন্তের বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় যাচাই করার জন্যই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, তাজমিনের পরিবার চাইলে রাজুর বিরুদ্ধে কক্সবাজারে সুনির্দিষ্ট আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের পরিচয়ের সূত্র ধরে গত ৬ অক্টোবর তাজমিন বাড়ি থেকে পালিয়ে কক্সবাজারে আসে। সেখানে কলাতলীর একটি আবাসিক হোটেলে রাজুর সঙ্গে সে অবস্থান করেছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। হোটেলের রেজিস্টার খাতায় তাজমিনের নাম ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করে তাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে পরদিন ৭ অক্টোবর সকালে তারা হোটেল ত্যাগ করেন। তদন্তে আরও জানা যায়, রাজুই তাজমিনের জন্য কুমিল্লাগামী বাসের টিকিট কেটে দিয়েছিলেন। ওই রাতে কুমিল্লায় ফিরে বাড়ি ফেরার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়ার সঙ্গে তাজমিনের দেখা হয় এবং সুমন তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে বলে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে।

গত ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানখেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের বাবার দায়ের করা হত্যা মামলায় গত ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করে কুমিল্লা ডিবি পুলিশ। পরবর্তীতে সুমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।

নিহত তাজমিন কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির অনিয়মিত শিক্ষার্থী ছিল। তার পরিবারের মূল নিবাস যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামে হলেও তার বাবা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সুবাদে তারা কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করতেন। চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলায় রাজুর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ বা তাজমিনের পরিবার থেকে এখনও চূড়ান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *