জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের বিষয়ে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘গ্রামীণ কল্যাণ’-এর দায়ের করা পৃথক দুটি রিট পিটিশন খারিজ করে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট বিভাগ। প্রকাশিত রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, গ্রামীণফোনের শেয়ারের প্রকৃত ও একমাত্র আইনি মালিক গ্রামীণ টেলিকম। গ্রামীণ কল্যাণ কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তির অধীনে অর্থের অংশীদার হলেও তারা গ্রামীণফোনের সরাসরি শেয়ারহোল্ডার নয়। ফলে এনবিআরকে ফাঁকি দিয়ে এই আয়কে ‘লভ্যাংশ আয়’ দেখিয়ে কম হারে কর দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই এবং বকেয়া রাজস্ব অবিলম্বে সরকারকে পরিশোধ করতে হবে। একই সাথে গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে অনাদায়ী কর আদায়ের লক্ষ্যে অবিলম্বে চাহিদা পত্র (ডিমান্ড নোটিশ) জারি করতে এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রায়ের অনুলিপির একটি ৩২ পৃষ্ঠা এবং অপরটি ১৫ পৃষ্ঠার। মামলার নথিসূত্রে জানা যায়, গ্রামীণ কল্যাণ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অনুদান ও ঋণ সমন্বয়ে গঠিত প্রায় ৩২০ কোটি টাকার একটি এন্ডোমেন্ট ফান্ডের অর্থ নিয়ে ২০১১ সালে গ্রামীণ টেলিকমের সাথে একটি নিবন্ধিত ‘ইকুইটি পার্টিসিপেশন এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী, গ্রামীণ টেলিকমের মাধ্যমে গ্রামীণফোনের শেয়ার কেনার উদ্দেশ্যে তারা ৫৩ কোটি ২৫ লাখ টাকারও বেশি অর্থ প্রদান করে এবং বিনিময়ে অর্জিত আয়ের ৪২.৬৫ শতাংশ পাওয়ার অধিকার লাভ করে।
পরবর্তী সময়ে ২০১২-২০১৩ থেকে ২০১৬-২০১৭ করবর্ষের জন্য রিটার্ন দাখিলের সময় গ্রামীণ কল্যাণ এই প্রাপ্ত আয়কে ‘ডিভিডেন্ড ইনকাম’ বা লভ্যাংশ হিসেবে প্রদর্শন করে এবং তার ওপর নির্ধারিত মাত্র ২০ শতাংশ হারে কর হিসেব করে জমা দেয়। তবে হাইকোর্ট রায়ে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার চুক্তির অন্যতম একটি শর্ত উদ্ধৃত করে উল্লেখ করেন, চুক্তিতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে গ্রামীণ কল্যাণ অর্থ সহায়তার বিনিময়ে গ্রামীণ টেলিকমের কাছে কখনোই গ্রামীণফোনের শেয়ারের মালিকানা দাবি করতে পারবে না।
আদালত তৎকালীন আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর সংশ্লিষ্ট ধারা বিশ্লেষণ করে পর্যবেক্ষণে বলেন, আইনিভাবে ‘ডিভিডেন্ড’ বা লভ্যাংশের সুবিধা পেতে হলে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে অবশ্যই সরাসরি প্রতিষ্ঠানের ‘শেয়ারহোল্ডার’ হতে হবে। যেহেতু গ্রামীণ কল্যাণ সরাসরি গ্রামীণফোনের শেয়ারহোল্ডার নয়, তাই তাদের অর্জিত এই বিশাল অর্থকে লভ্যাংশ হিসেবে গণ্য করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। এই আয়কে আইন অনুযায়ী ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং সাধারণ হারেই আয়কর প্রদান করতে হবে। হাইকোর্ট চূড়ান্ত আদেশে পূর্বের স্থগিতােদশ বাতিল করে রিট রুলগুলো বাতিল ঘোষণা করেন।

