প্রধান খবর

শিশু রামিসা হত্যা মামলা: বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আজ রায় ঘোষণা

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার বহুল আলোচিত মামলার রায় আজ রোববার ঘোষণা করা হবে। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এই ঐতিহাসিক মামলার রায় প্রকাশ করবেন। দেশের বিচারিক ইতিহাসে দ্রুততম সময়ে তদন্ত ও ট্রায়াল শেষ হওয়া এই মামলাটির রায়ের দিকে এখন দেশবাসীর দৃষ্টি।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১৯ মে। পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে নিজের ফ্ল্যাটে ডেকে নেয়। ঘণ্টাখানেক পর রামিসার মা তাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে স্বপ্নার ঘরের সামনে রামিসার জুতা দেখতে পেয়ে সন্দেহ হলে ডাকাডাকি করা হয়। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও রামিসার বাবা-মা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে শয়নকক্ষের মেঝেতে শিশুটির মস্তকবিহীন দেহ এবং ঘরের একটি বড় বালতির ভেতর থেকে তার বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করা হয়।

নৃশংস এই ঘটনার পর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে তথ্য পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্বপ্না আক্তারকে হেফাজতে নেয়। ঘটনার দিনই তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রধান আসামি সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন ২০ মে রামিসার বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ দণ্ডবিধির ৩০২ ও ২০১ ধারায় মামলা দায়ের করেন।

হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠলে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেওয়া হয়। তদন্ত সংস্থা ডিএনএ রিপোর্ট, ফরেনসিক আলামত ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ করে অপরাধের অকাট্য প্রমাণ জোগাড় করে। ঘটনার মাত্র ৫ দিনের মাথায়, ২৪ মে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। যেখানে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যা এবং তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।

১ জুন ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। ২ জুন রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়, যার মধ্যে ছিলেন ভুক্তভোগীর বাবা-মা, প্রতিবেশী, পুলিশ ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। ৩ জুন ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন।

গত ৪ জুন যুক্তিতর্ক শুনানিতে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, তদন্ত ও বিচারে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘চেইন অব ফ্যাক্ট’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা আসামিদের অপরাধকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে। রাষ্ট্রপক্ষ দুই আসামিরই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োজিত আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ প্রধান আসামির যাবজ্জীবন এবং সহযোগীর সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ডের আবেদন জানান।

মামলাটি দায়ের থেকে শুরু করে যুক্তিতর্ক পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া মাত্র ১৭ দিনে সম্পন্ন হওয়াকে দেশের বিচারব্যবস্থার একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। রায়ের আগের দিন এক গোলটেবিল বৈঠকে রামিসার বাবা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমি শুধু আমার সন্তানের হত্যার বিচার চাই না, বরং এমন একটি সমাজ ও বিচারব্যবস্থা চাই যেখানে আর কোনো শিশুকে এভাবে প্রাণ হারাতে হবে না।” আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আজকের এই রায় শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে একটি কঠোর বার্তা দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *