দুই দশক আগে ব্রাজিলের একটি প্রীতি ম্যাচের জন্য থমকে গিয়েছিল ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র হাইতির রাজধানী পোর্ট-অব-প্রিন্স। সে সময় অস্ত্রের গর্জন থেমেছিল, রাস্তায় নেমেছিল হাজার হাজার মানুষ। এবার আবারও ফুটবল সেই দেশটিকে নতুন করে এক অনন্য স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তবে এবার কেবল দর্শক হিসেবে নয়, বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নিজেদের জাতীয় দলকে নিয়েই উচ্ছ্বসিত হাইতির আপামর জনতা।
তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভয়াবহ গ্যাং সহিংসতা এবং দীর্ঘ মানবিক সংকটের মধ্যেও বিশ্বকাপ ঘিরে দেশটিতে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব উৎসবের আবহ। গ্রুপ পর্বে পরাশক্তি ব্রাজিল, স্কটল্যান্ড ও মরক্কোর সঙ্গে একই গ্রুপে পড়েছে হাইতি। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে টাঙানো হয়েছে জাতীয় পতাকা, পরিষ্কার করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো। বিদ্যুতের তীব্র সংকট থাকা সত্ত্বেও খেলা দেখার জন্য নানা বিকল্প ব্যবস্থা ও জেনারেটরের আয়োজন করছেন সমর্থকরা।
হাইতির ইতিহাসে এটি মাত্র দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। ১৯৭৪ সালের পর এবারই প্রথম ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসরে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে ক্যারিবীয় দেশটি।
হাইতির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ডুকেন্স নাজঁ বলেন, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলা তাদের কাছে শুধুই একটি ম্যাচ খেলা নয়, বরং দেশের ইতিহাস ও পরিচয় বহনের বড় দায়িত্ব।
ডুকেন্স নাজঁ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “আমরা বিশ্বের প্রথম স্বাধীন কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্র। আমাদের গৌরবময় ইতিহাস আছে, দায়িত্বও আছে। মাঠে নামলে আমরা শুধু নিজেদের জন্য খেলি না, খেলছি পুরো দেশের জন্য।”
তবে দেশটির বর্তমান বাস্তব চিত্র অত্যন্ত কঠিন। গ্যাং সহিংসতার কারণে গত পাঁচ বছর ধরে নিজেদের মাটিতে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে পারেনি হাইতি। এমনকি দেশটির জাতীয় স্টেডিয়ামও এখন সশস্ত্র অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফলে নিজেদের ‘হোম ম্যাচ’ খেলতে হচ্ছে দেশ থেকে প্রায় ৫০০ মাইল দূরের দ্বীপ কারাকাও-এ।
জাতীয় দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই বিদেশে জন্ম নেওয়া অথবা বিভিন্ন বিদেশি লিগে খেলছেন। ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের ফুটবলাররা বর্তমানে ১৫টি দেশের ২৫টি আলাদা ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এমন প্রতিকূল বাস্তবতায়ও পুরো দলটিকে এক সুতোয় গেঁথেছেন ফরাসি কোচ সেবাস্তিয়ান মিগনে।
বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ার পর হাইতির বিভিন্ন স্থানে উদযাপনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, কট্টর গ্যাং সদস্য এবং সাধারণ মানুষ সব ভুলে একসঙ্গে আনন্দ করছেন। সেই স্মৃতি মনে করে নাজঁ বলেন, ফুটবল এমন এক অবিশ্বাস্য শক্তি, যা মানুষকে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও সব বিভাজনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে।
পোর্ট-অব-প্রিন্সে এখন ফুটবলকে ঘিরে আশার আলো দেখছেন অনেকেই। দেশটির ক্রীড়া সাংবাদিক পিয়েরে রিচার্ড মিদি বলেন, “গ্যাং নেতারাও ফুটবল ভালোবাসে। বিশ্বকাপ নিশ্চিত হওয়ার পর তাদেরও অস্ত্র ফেলে রাস্তায় নেমে সাধারণ মানুষের সাথে উদযাপন করতে দেখা গেছে।”
চলতি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে আবারও ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে হাইতি। একসময় যে দলটিকে নিজেদের দল ভেবে সমর্থন দিত হাইতির মানুষ, এবার সেই সেলেসাওদের বিপক্ষেই মাঠে লড়বে তাদের নিজেদের জাতীয় দল।
ডুকেন্স নাজঁ’র বিশ্বাস, সময় এবার বদলেছে। এখন হাইতির মানুষের গর্ব করার মতো নিজস্ব একটি শক্তিশালী দল আছে। তার ভাষায়, “মানুষ ব্রাজিলকে পছন্দ করতেই পারে, কিন্তু এখন তাদের নিজেদের একটি বিশ্বকাপ দল আছে। সেই দলকে নিয়েই এখন বিশ্বমঞ্চে গর্ব করার সময় এসেছে।”
সব মিলিয়ে গ্যাং সহিংসতা, চরম দারিদ্র্য আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অন্ধকারের মধ্যেও হাইতির কাছে এই বিশ্বকাপ শুধু ফুটবল নয়; এটি একতা, বেঁচে থাকার আশা এবং একটি নতুন ভবিষ্যতের প্রতীক।

