বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন রাতারাতি প্রতিভা প্রকাশের এক অনন্য মঞ্চ। সম্প্রতি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের দেওয়ালে হিজাব পরে ড্রামসে নিখুঁত ছন্দ আর ঝড়ো গতিতে বাদ্য বাজানো এক তরুণীর ভিডিও ক্লিপ তুমুল সাড়া ফেলেছে। ধর্মীয় পোশাক পরিহিত অবস্থায় ওয়েস্টার্ন ঘরানার এমন একটি বাদ্যযন্ত্রে তাঁর অসাধারণ পারদর্শিতা দেখে নেটজনতা যেমন অবাক হয়েছেন, তেমনই প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। রাতারাতি ভাইরাল হওয়া এই আলোচিত ড্রামার তরুণীর নাম নাজিয়া সামান্থা। নেটিজেনদের আলোচনার টেবিল ছাড়িয়ে তিনি এখন মূলধারার সংবাদমাধ্যমেরও আকর্ষণের কেন্দ্রে চলে এসেছেন।
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে নাজিয়া তাঁর জীবনের এই আকস্মিক পরিবর্তনের গল্প ও ভালোলাগার কথা শেয়ার করেছেন। তিনি জানান, ২০২৩ সালের পূর্ববর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে তিনি পবিত্র হজব্রত পালন করেন। হজে যাওয়ার আগে তাঁর জীবনধারা কিছুটা ভিন্ন ছিল। সে সময় তিনি নিয়মিত নাচ ও রিং ড্যান্সের মতো পারফর্মিং আর্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে হজের পর ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার তাগিদে তিনি সেসব কিছু পুরোপুরি ছেড়ে দেন। তবে শৈশব থেকে লালন করা ড্রামসের প্রতি এক সহজাত ও আত্মিক টান তিনি কিছুতেই এড়াতে পারেননি।
নাজিয়ার সংগীতের ভুবনে পথচলা মূলত তাঁর বাবার হাত ধরে। ছোটবেলা থেকেই বাবার অনুপ্রেরণায় গানে ও সুরের আবহে তাঁর বিচরণ শুরু হয়। এ বিষয়ে নাজিয়া বলেন, “মিউজিক লাইনে আসার পেছনে মূল অবদান আমার বাবার। ছোটবেলা থেকেই বাবা আমাকে নিজ দায়িত্বে গিটার, ভায়োলিন ও ড্রামসসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখিয়েছেন। মূলত বাবার হাত ধরেই সংগীতের সাথে আমার গভীর সংযোগ তৈরি হয়।
সামান্থার এই ভাইরাল হওয়ার পেছনে রয়েছে এক আকস্মিক ও মজার গল্প। তাঁর ভাইয়ের ‘নবজাত’ নামের একটি মিউজিক্যাল ব্যান্ড রয়েছে। একদিন ক্লাসে থাকাকালীন নাজিয়ার এক বন্ধুকে ওই ব্যান্ডের সদস্য জাওয়াদ একটি শোতে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। বন্ধুদের সঙ্গে নাজিয়াও সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে উপস্থিত একজন শিক্ষক নাজিয়াকে চিনতে পেরে বলেন, “তুমি তো বাজাতে পারো, স্টেজে উঠে একটু বাজাও তো।” শিক্ষকের অনুরোধে ও জাস্ট জ্যামিং (Jamming) করার উদ্দেশ্যে নাজিয়া ড্রামসের আসনে বসেন এবং ব্যান্ডের গানের সাথে তাল মিলিয়ে বাজাতে শুরু করেন। পরবর্তীতে সেই পারফরম্যান্সের ভিডিও কেউ একজন সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করলে তা মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়।
তবে হিজাব পরে পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র ড্রামস বাজানোটা সামাজিক প্রেক্ষাপটে মোটেও সহজ ছিল না নাজিয়ার জন্য। ইন্টারনেটে প্রশংসার পাশাপাশি রক্ষণশীল অনেকের কাছ থেকে তাঁকে নানা রকম নেতিবাচক মন্তব্য ও কটূক্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে এসবে দমে যাওয়ার পাত্রী নন তিনি। নিজের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়ে নাজিয়া বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকেই মানুষের কথাকে পাত্তা দিই না, এখনো দিচ্ছি না। ড্রামস বাজানোটা আমার নিজস্ব ইচ্ছা ও শখ, আর হিজাব পরাটাও আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। হজের কারণে আমি হিজাব ধরেছি, আর ড্রামস আমার ভালোবাসা। তাই নেতিবাচক মন্তব্যগুলো আমি কানে নিই না। যারা ইতিবাচক কথা বলে ভালোবাসা দিচ্ছেন, তাঁদের অনুপ্রেরণা নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চাই।”
পেছনে লোকে যাই বলুক না কেন, নাজিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর পরিবার। শুরু থেকেই বাবা-মা ও ভাইয়ের পূর্ণ সমর্থন পেয়ে এসেছেন তিনি। বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এই ভাইরাল তরুণী জানান, আজ তিনি যতটুকু আসতে পেরেছেন এবং যেটুকু করতে পারছেন, তার সিংহভাগ অবদানই তাঁর বাবার।

