প্রধান খবর

বাংলা সিনেমার ‘করিম চাচা’মারা যান ঠান্ডা ও শ্বাসকষ্ট থেকে

অভিনয়জগতে কোনো অভিমান ছিল না, কেবল ইচ্ছা ছিল জীবনের কোনো এক সন্ধিক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে কাজ করার। দীর্ঘ ৩০ বছরের ক্যারিয়ারে বহু দিন এফডিসির করিডোরে ঘুরেও যে সুবর্ণ সুযোগ তিনি পাননি, অবশেষে দেশের গুণী পরিচালক তারেক মাসুদ তাঁকে ‘মাটির ময়না’ সিনেমায় সেই সুযোগ করে দেন। ‘এক্সট্রা’ বা জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করা করিম চাচা খ্যাত অভিনেতা আবদুল করিম খানের জীবনের সেরা দিন ছিল সেটাই।

ঢালিউড চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ আবদুল করিম মূলত বস্তিবাসী, ভিক্ষুক, ভৃত্য, কিংবা মিছিল-মিটিংয়ের ভিড়ে দাঁড়ানো চরিত্রেই অভিনয় করতেন। সংলাপ থাকুক বা না থাকুক, ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর শখেই আশির দশকের শুরুতে চলচ্চিত্রে পথচলা শুরু করেছিলেন এই গুণী মানুষটি।

করিম চাচার ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রে যুক্ত হওয়ার গল্পটি ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। এক স্মৃতিচারণে প্রয়াত তারেক মাসুদ বলেছিলেন, দীর্ঘদিন বড় কোনো চরিত্র না পাওয়া করিম চাচাকে যখন একটি প্রধান চরিত্রে নেওয়ার কথা বলা হয়, তখন তিনি খুশিতে আত্মহারা হয়ে যান। শুটিংয়ের প্রথম দিনেই ভালো লাগার উত্তেজনায় তিনি কমপ্লিট স্যুট ও মাথায় হ্যাট পরে ইউনিটে হাজির হন! যদিও পরবর্তীতে তাঁকে একজন নাপিতের চরিত্রে দারুণভাবে অভিনয় করতে দেখা যায়। পরিচালক তারেক মাসুদের ভাই নাহিদ মাসুদ জানান, করিম চাচার অভিনয় নিখুঁত করতে একজন পেশাদার নাপিতকে নির্দেশক হিসেবে রাখা হয়েছিল, যা দেখে তিনি নিজেকে ভীষণ সম্মানিত বোধ করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের আগে পরিবারসহ সিলেট থেকে ঢাকার সূত্রাপুরে আসেন আবদুল করিম। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পরিবারের সকলকে হারানোর পর পুরান ঢাকায় অবস্থান নেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সালে গাজীপুরের কাপাসিয়ার কামড়া গ্রামে বিয়ে করে সেখানেই স্থায়ী হন। একটি পত্রিকা অফিসে চাকরির পাশাপাশি মঞ্চনাটক ও যাত্রাপালায় অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর এই জগতে প্রবেশ। ‘মাটির ময়না’, ‘প্রেমের অহংকার’, ‘অধিকার চাই’, ‘সৎ মানুষ’, ‘ভুলোনা আমায়’সহ তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। মাত্র ১-২ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পেলেও সেই উপার্জনে সন্তানদের পড়াশোনা করানো ও গ্রামে জমি জমার বন্দোবস্ত করেছিলেন তিনি।

শুটিংয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অগাধ। ২০০৯ সালে কক্সবাজারে একটি চলচ্চিত্রের শুটিংয়ে গিয়ে তিনি তীব্র ঠান্ডা ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হন। শুটিং শেষে ঢাকায় ফিরেই সহকর্মীদের সহায়তায় হাসপাতালে ভর্তি হন। কিছুটা সুস্থ হয়ে গ্রামের বাড়ি কাপাসিয়ায় ফিরলেও শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০০৯ সালের ২২ জুলাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৮০ দশকের এই প্রবীণ অভিনেতা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *