পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বিশ্বের অন্যতম বিলুপ্তপ্রায় ও চরম বিপন্ন মাতৃভাষা ‘রেংমিটচ্য’ সংরক্ষণের লড়াইয়ে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এই ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারা পৃথিবীর মাত্র ছয়জন মানুষের মধ্যে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে পৃথিবীতে এখন এই ভাষাটি টিকিয়ে রাখার মতো জীবিত মানুষের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র পাঁচজনে। অবশিষ্ট বক্তাদের মধ্যে ষাটোর্ধ্ব বয়সী দুজনও বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ বলে জানিয়েছেন ভাষাটির গবেষক আফসানা ফেরদৌস আশা।
মারা যাওয়া রেংমিটচ্যভাষী ব্যক্তি হলেন বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দুর্গম সাংপ্লং পাড়ার বাসিন্দা মাওযাই ম্রো (৬৪)। গত ৫ মে লিভারের জটিলতা ও অন্যান্য বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে তৈনখালের ক্রাংসি পাড়ায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার অন্য দুই ভাই মাংপুং ম্রো (৭৪) ও রেংপুং ম্রো (৭০)-ও বর্তমানে প্রচণ্ড অসুস্থ। এই তিন ভাই আলাদা আলাদা দুর্গম এলাকায় বসবাস করতেন।
বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনে রেংমিটচ্য ভাষার ডিজিটাল তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টেশন নিয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন আফসানা ফেরদৌস আশা। তিনি জানান, গবেষণার কাজে গত বছর টানা সাত মাস আলীকদমে অবস্থান করে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এই ছয়জন রেংমিটচ্যভাষীকে নতুন করে খুঁজে বের করেছিলেন তিনি। মাওযাই ম্রোর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আরেকজন বক্তা চলে গেলে এই ভাষাকে বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই দিন-রাত এক করে এর সংরক্ষণের কাজ করছি।” তিনি জীবিত বক্তাদের সহায়তায় রেংমিটচ্য ভাষার একটি ১৫০০ শব্দের বইয়ের খসড়াও প্রস্তুত করেছেন।
এর আগে, এই বিপন্ন ভাষাটি টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে ‘মিটচ্য তখক’ নামে একটি কথোপকথনের বই প্রকাশ করেছিলেন ম্রো ভাষার স্থানীয় গবেষক ইয়াইঙান ম্রো। যেহেতু রেংমিটচ্য ভাষার নিজস্ব কোনো লিপি বা বর্ণমালা নেই, তাই বইটি ম্রো ও বাংলা লিপির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। ২৮ পৃষ্ঠার সেই বইটিতে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি শব্দ সংকলিত হয়েছে, যা হয়তো এই ভাষাটির শেষ স্মৃতিস্মারক হিসেবে টিকে থাকবে।
বর্তমানে পৃথিবীতে রেংমিটচ্য ভাষায় কথা বলতে পারা অবশিষ্ট পাঁচজন হলেন—মাংপুং ম্রো (৭৪), কুনরাও ম্রো (৬১), আরেক কুনরাও ম্রো (৭৪), থোয়াই লক ম্রো (৬০) এবং রেংপুং ম্রো (৭০)। এদের মধ্যে দুজন নারী ও তিনজন পুরুষ। ভাষা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অবশিষ্ট এই পাঁচজন প্রবীণ মানুষ মারা গেলে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে রেংমিটচ্য ভাষা। তবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, এই বিপন্ন ভাষার ডিজিটাল তথ্যচিত্র সংরক্ষণের মাধ্যমে এটিকে ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য টিকিয়ে রাখার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

