পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেসে বিদ্রোহ। বিধানসভা নির্বাচনে বড় ধরনের ধাক্কার পর দলটির অভ্যন্তরীণ সংকট এখন প্রকাশ্য বিভক্তিতে রূপ নিয়েছে। বিদ্রোহী নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে দলীয় প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাকে রাজনৈতিকভাবে দমাতে চাইলে একমাত্র পথ হলো তাকে হত্যা করা। তার এই মন্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তুমুল আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচনী ফল প্রকাশের পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। সময়ের সঙ্গে সেই অসন্তোষ বড় ধরনের বিদ্রোহে পরিণত হয়। দলের ৮০ জন বিধায়কের একটি বড় অংশ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আলাদা অবস্থান নেওয়ায় কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে দলটি। এই পরিস্থিতিকে তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক সংকট হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সংকটের মধ্যেই শনিবার (৪ জুলাই) তৃণমূল আরও একটি বড় ধাক্কা খায়। দলের পশ্চিমবঙ্গ শাখার প্রধান চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য পদত্যাগ করে বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেন। তার এই সিদ্ধান্ত দলীয় অস্থিরতাকে আরও তীব্র করে তোলে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।
বিদ্রোহীদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, দলের প্রতীক ও পরিচয় কোনোভাবেই অন্য কারও হাতে যেতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, যারা তাকে থামাতে চান, তারা চাইলে তাকে মেরে ফেলতে পারেন, কিন্তু তিনি তার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াবেন না। একই সঙ্গে তিনি বিদ্রোহীদের ‘বেইমান’ ও ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, যাদের মনোনয়নে তিনি নিজে স্বাক্ষর করেছিলেন, তারাই অল্প সময়ের ব্যবধানে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, বিদ্রোহী নেতারা বিজেপির চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কোনো পরিস্থিতিতেই তিনি বিজেপির সামনে মাথা নত করবেন না। তার এই বক্তব্যকে দলের কর্মীদের প্রতি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এদিকে দলীয় কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও বিরোধ চরমে পৌঁছেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কার্যালয়টি ২০২৭ সাল পর্যন্ত বৈধভাবে লিজ নেওয়া এবং সেটি তৃণমূল কংগ্রেসের সম্পত্তি। তিনি আরও জানান, দলের জাতীয় ও রাজ্য পর্যায়ের দায়িত্ব আপাতত তার বাসভবনের অফিস থেকেই পরিচালিত হবে এবং সেটিকেই দলের প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
তৃণমূল কংগ্রেসে বিদ্রোহ এখন শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নেই; বিষয়টি আইনি লড়াইয়েও গড়িয়েছে। জোড়াফুল প্রতীকের প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণে নির্বাচন কমিশন উভয় পক্ষকে আগামী ৬ জুলাই বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ফলে প্রতীক, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং নেতৃত্ব—তিনটি ইস্যুতেই এখন মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে দুই পক্ষ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট তৃণমূল কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কঠোর অবস্থান দলকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করতে পারে কি না, নাকি তৃণমূল কংগ্রেসে বিদ্রোহ আরও গভীর হবে—সেই উত্তরই আগামী দিনের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।

