প্রধান খবর

মগবাজার আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু

রাজধানী ঢাকার মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে (এনআইসিইউ/স্ক্যানু) এক হূদয়বিদারক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ভোর হতে না হতেই একে একে প্রাণ হারিয়েছে ছয়টি সদ্যোজাত শিশু। প্রাথমিক আলামত ও ভুক্তভোগী স্বজনদের দাবি, ওয়ার্ডের ভেতরে থাকা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) গ্যাস লিকেজ থেকে নির্গত বিষাক্ত রাসায়নিকের কারণেই এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির পেছনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি ও অবহেলাকে দায়ী করছেন অভিভাবকেরা। আজ বুধবার (২৭ মে) সকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

হাসপাতাল সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শী স্বজনদের বিবরণ অনুযায়ী, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টার পর থেকেই নবজাতক ওয়ার্ডের ভেতরে থাকা এক থেকে চার দিন বয়সী শিশুগুলো হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে কান্না ও চিৎকার শুরু করে। এর কিছুক্ষণ পরই বেশ কয়েকটি শিশু বমি করতে থাকে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ওয়ার্ডে নিয়োজিত নার্স ও কর্তব্যরত চিকিৎসকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। স্বজনদের অভিযোগ, ওই সময় ভেতরকার এসিগুলো বন্ধ হয়ে যায় এবং তীব্র ভ্যাপসা গরমে শিশুরা আরও নিস্তেজ হয়ে পড়ে। শুধু শিশুরাই নয়, এসির বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রতায় ভেতরে থাকা এক শিশুর স্বজনও মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন, যাকে পরবর্তীতে ওই হাসপাতালেই জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

নিহত এক শিশুর চাচা ক্ষোভ ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “গতকাল রাতেই আমরা ফুটফুটে বাচ্চাটিকে কোলে নিয়েছি, মা পরম মমতায় বুকের দুধ পান করিয়েছে। রাত ১২টার পর হঠাৎ পুরো ওয়ার্ডে চিল্লাচিল্লি শুরু হয়। নার্সরা দিগ্বিদিক দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে, কিন্তু আমাদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কোনো বাচ্চার মা-বাবা সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। সকাল হতে না হতেই আমাদের কোল খালি করে তারা লাশের তালিকা ধরিয়ে দিল।” অপর এক শিশুর স্বজন জানান, চার দিন আগে জন্ম নেওয়া তাদের শিশুটির আজ বুধবার সকালে সুস্থ অবস্থায় রিলিজ হওয়ার কথা ছিল। ঈদের আগে বাড়ি ফেরার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পরও তাদের শেষ পর্যন্ত লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।

এদিকে, এই ঘটনায় হাসপাতালজুড়ে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। বুধবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন হতভাগ্য মা-বাবা তাদের ১-২ দিন বয়সী মৃত সন্তানকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দা ও বাইরে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। ঘটনার খবর পেয়ে ডিএমপির রমনা বিভাগসহ স্থানীয় থানা পুলিশ এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিট ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলামত সংগ্রহ শুরু করেছে।

মৃত শিশুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখনো কিছুটা ধোঁয়াশা রয়েছে। স্বজনদের দাবি, ভেতরে অন্তত ১৫ জন শিশু চিকিৎসাধীন ছিল এবং তার মধ্যে অন্তত ১১ থেকে ১২ জন মারা গেছে। তবে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ছয় শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করেছে।

রমনা বিভাগের ডিসি শেখ জাহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা খবর পেয়েই দ্রুত আদ-দ্বীন হাসপাতালে আসি এবং এখন পর্যন্ত ছয়টি নবজাতকের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হয়েছি। তবে এই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এসি লিকেজ, বিষাক্ত গ্যাস নাকি অন্য কোনো চিকিৎসাজনিত অবহেলা—তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ক্রাইম সিন ইউনিট ভেতরের বাতাস ও কারিগরি বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে। তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *