ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় আইরিশ হোটেলের পাশ থেকে নিখোঁজ হওয়ার ১২ ঘণ্টা পর বুলেট বৈরাগী (৩৫) নামে এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আজ শনিবার সকালে পুলিশ মহাসড়কের ফুটপাত থেকে তার মরদেহটি উদ্ধার করে। নিহত বুলেট বৈরাগী ঢাকা কাস্টমস হাউসের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগে কর্মরত ছিলেন।
পারিবারিক ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুলেট বৈরাগী গত ১১ এপ্রিল সরকারি বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে চট্টগ্রামে যান। কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমিতে ৪৪তম ব্যাচের এই প্রশিক্ষণ শেষে গতকাল শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রাত ১১টার দিকে তিনি চট্টগ্রামের অলঙ্কার মোড় থেকে বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
যাত্রাপথে পরিবারের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ হয়। সর্বশেষ রাত ২টা ২৫ মিনিটে তিনি তার স্ত্রীকে ফোন করে জানান যে, বাসটি কুমিল্লা নগরীর টমছমব্রিজ চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছেছে এবং তিনি দ্রুতই ঢাকা পৌঁছাবেন। তবে এরপর থেকে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও তিনি বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
শনিবার সকালে বুলেট বৈরাগীর বাবা সুশীল বৈরাগী কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এদিকে, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল পেয়ে ময়নামতি হাইওয়ে থানা পুলিশ কোটবাড়ি এলাকার আইরিশ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের পাশের ফুটপাত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে। পরবর্তীতে দুপুর ১টার দিকে স্বজনরা থানায় গিয়ে মরদেহটি বুলেট বৈরাগীর বলে শনাক্ত করেন।
ময়নামতি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল মমিন জানান, “মরদেহে বাহ্যিকভাবে বড় কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়নি, তবে মুখমণ্ডল কিছুটা রক্তাক্ত ছিল। প্রাথমিক অবস্থায় ধারণা করা হচ্ছে এটি কোনো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে অথবা এর পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে।”
বুলেট বৈরাগী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের ৫ম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার এই অকাল ও রহস্যজনক মৃত্যুতে সহকর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বুলেটের স্ত্রী ঊর্মি হিরা আজ বেলা ১১টায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্বামীর নিখোঁজ সংবাদ জানিয়ে একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি সকলের সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টা পরেই তিনি মাত্র এক বাক্যের স্ট্যাটাসে লেখেন— ‘আমার বুলেট মারা গেছে’। উল্লেখ্য, গত ২২ এপ্রিল এই দম্পতি তাদের বিবাহ বার্ষিকী পালন করেছিলেন, যার স্মৃতিচারণ করে ঊর্মি ফেসবুকে ছবিও শেয়ার করেছিলেন। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে আনন্দঘন সেই পরিবারে নেমে এলো চরম বিষাদ।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে নিখোঁজ ডায়েরি করার পরপরই পুলিশ তদন্ত শুরু করেছিল। মরদেহটি বর্তমানে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি আরও জানান, এই ঘটনায় একটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে এবং পুলিশ মহাসড়কের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে খতিয়ে দেখছে।
কাস্টমস বিভাগের একজন উদীয়মান কর্মকর্তার এমন রহস্যজনক মৃত্যুতে বিভাগীয় পর্যায়েও শোক প্রকাশ করা হয়েছে। সহকর্মীরা এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।

