যুক্তরাজ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রভাবশালী অবস্থান ব্যবহার করে ক্লাউড কম্পিউটিং বাজারে অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে ১.৭ বিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ২.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ক্ষতিপূরণ দাবি করে একটি ‘ক্লাস অ্যাকশন’ মামলা দায়ের করা হয়েছে।
লন্ডন থেকে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ডিজিটাল মার্কেটস রেগুলেশন বিশেষজ্ঞ মারিয়া লুইসা স্টাসি প্রায় ৫৯ হাজার ব্রিটিশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার পক্ষে এই মামলাটি পরিচালনা করছেন। মামলার মূল অভিযোগ হলো, মাইক্রোসফট তাদের বহুল ব্যবহৃত ‘উইন্ডোজ সার্ভার’ সফটওয়্যারের লাইসেন্সিং নীতি এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে গ্রাহকরা প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম (যেমন অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিস বা গুগল ক্লাউড) ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, অন্য প্ল্যাটফর্মে উইন্ডোজ ব্যবহার করতে গেলে গ্রাহকদের অতিরিক্ত চার্জ দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
মারিয়া লুইসা স্টাসি মামলার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “বছরের পর বছর ধরে মাইক্রোসফটের এই একাধিপত্যমূলক কার্যক্রম সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আর্থিক প্রভাব ফেলেছে। এটি কেবল প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করেনি, বরং উদ্ভাবনের পথও রুদ্ধ করেছে।”
যুক্তরাজ্যের আপিল ট্রাইব্যুনাল (Competition Appeal Tribunal) গত মঙ্গলবার মামলাটিকে বিচার প্রক্রিয়ায় নেওয়ার অনুমতি প্রদান করেছে। ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা মন্তব্য করেছেন যে, এই অভিযোগগুলোর ‘যৌক্তিকভাবে সফল হওয়ার সম্ভাবনা’ রয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মাইক্রোসফটের পেইড সার্ভার অপারেটিং সিস্টেম বাজারে তাদের আধিপত্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ক্লাউড সেবার বাজারে অন্য প্রতিযোগীদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এই মামলা সফল হয়, তবে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ১.৭ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ২.১ বিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা ব্রিটিশ আইনি ইতিহাসে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অন্যতম বড় আর্থিক দণ্ড হবে।
এদিকে মাইক্রোসফট শুরু থেকেই এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা আদালতের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করবে। মাইক্রোসফটের দাবি, তাদের লাইসেন্সিং নীতিগুলো বৈশ্বিক মানদণ্ড মেনেই তৈরি এবং আদালতের বর্তমান সিদ্ধান্তটি কোনো চূড়ান্ত রায় নয়। তারা দৃঢ়ভাবে এই অভিযোগগুলোর বিরোধিতা করার ঘোষণা দিয়েছে।
মাইক্রোসফটের জন্য এই আইনি লড়াই কেবল যুক্তরাজ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও প্রতিষ্ঠানটির ক্লাউড বাজারে সফটওয়্যার লাইসেন্সিং কার্যক্রম নিয়ে পৃথক তদন্ত পরিচালনা করছে। গত কয়েক বছরে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর (Big Tech) একাধিপত্য নিয়ন্ত্রণে ইউরোপীয় দেশগুলো কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যার ধারাবাহিকতায় মাইক্রোসফটের এই মামলাটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার ফলাফল কেবল মাইক্রোসফটের আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং ভবিষ্যতে বৈশ্বিক ক্লাউড কম্পিউটিং বাজারের ব্যবসায়িক মডেলেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

