চীন সম্প্রতি তাদের জাহাজ নির্মাণ শিল্পে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করেছে। চীনের নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত দ্বিতীয় বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজ ‘অ্যাডোরা ফ্লোরা সিটি’ গত ২০ মার্চ সাংহাইয়ের ড্রাই–ডক থেকে সফলভাবে পানিতে নামানো (ফ্লোট–আউট) হয়েছে।
এটি চীনের ক্রুজ শিপ নির্মাণ সক্ষমতায় নতুন অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূলত, এই বিশাল প্রমোদতরীটি নির্মাণ করেছে চায়না স্টেট শিপবিল্ডিং কর্পোরেশন (CSSC)-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান সাংহাই ওয়াইগাওকিও শিপবিল্ডিং (SWS)।
‘অ্যাডোরা ফ্লোরা সিটি’ ক্রুজ শিপের মূল মালিকানা ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে অ্যাডোরা ক্রুজ লিমিটেড, যা CSSC এবং বিশ্বের বৃহত্তম ক্রুজ অপারেটর কার্নিভাল কর্পোরেশন অ্যান্ড পিএলসি–এর যৌথ উদ্যোগে গঠিত একটি কোম্পানি।
এই প্রমদতরীটি চীনের নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত হলেও, এর ডিজাইন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে ইতালির শীর্ষস্থানীয় জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফিনক্যান্টিয়েরি। আর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এই সমন্বয় উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটিকে আরও পরিপূর্ণতা দিয়েছে।
জাহাজটি নির্মাণের প্রজেক্ট শুরু থেকে একেবারে শেষ পর্যন্ত হয়ত আনুমানিক ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হতে পারে। যেখানে চীনের প্রথম দেশীয়ভাবে নির্মিত বৃহৎ ক্রুজ জাহাজ ‘অ্যাডোরা ম্যাজিক সিটি’ নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
আসলে, প্রযুক্তিগত দিক থেকে ‘অ্যাডোরা ফ্লোরা সিটি’ একটি অত্যাধুনিক স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রায় ১ লক্ষ ৪১ হাজার ৯০০ গ্রোস টন ওজনের এই জাহাজটির দৈর্ঘ্য ৩৪১ মিটার এবং প্রস্থ ৩৭.২ মিটার। এতে ১৬টি যাত্রী ডেক ও ২,১৩০টি কেবিন রয়েছে, যা সর্বমোট ৫,২০০–এরও বেশি যাত্রী বহনে সক্ষম।
চীনের প্রথম দেশীয় ক্রুজ শিপ ‘অ্যাডোরা ম্যাজিক সিটি’–এর তুলনায় নতুন এই জাহাজটি আকারেও কিছুটা বড়ো এবং আধুনিক। এটি প্রায় ১৭ মিটার দীর্ঘতর এবং এতে অতিরিক্ত ১৯টি কেবিন সংযোজন করা হয়েছে। জাহাজটির সর্বোচ্চ গতি প্রায় ২৩ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ৪৩ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা)।
জাহাজটিতে উন্নত এক্সহস্ট গ্যাস ট্রিটমেন্ট ও ডিসালফারাইজেশন সিস্টেম সংযোজন করা হয়েছে। পাশাপাশি শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থায় রয়েছে ৫টি জেনারেটর, প্রতিটির ক্ষমতা প্রায় ১৬.৮ মেগাওয়াট; সম্মিলিতভাবে এগুলো প্রায় ৮৪ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে সক্ষম।
এছাড়া, জাহাজটিতে ডুয়েল–ফুয়েল প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে। এর ফলে সালফার নির্গমন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা সম্ভব হবে এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
যাত্রীসেবার দিক থেকেও জাহাজটিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে চীনা ও আন্তর্জাতিক ঘরানার একাধিক আধুনিক রেস্টুরেন্ট ও বার থাকবে। পাশাপাশি পরিচালনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আধুনিক স্মার্ট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-নির্ভর প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে।
এই প্রমদতরীতে যাত্রীদের বিনোদনের জন্য এতে আধুনিক ওয়াটার পার্ক, খোলা ডেকে সবুজ বাগান ও জগিং ট্র্যাক, বিশ্বমানের শপিং সুবিধা এবং ডিউটি–ফ্রি স্টোর রাখা হয়েছে। এছাড়া একটি বৃহৎ থিয়েটার হলে আন্তর্জাতিক মানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মিউজিক্যাল শো ও অপেরা আয়োজন করা হবে।
বর্তমানে জাহাজটির নির্মাণকাজ প্রায় ৯২ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং এটি পিয়ার কমিশনিং পর্যায়ে রয়েছে। আগামী মে মাসের শেষদিকে সমুদ্র পরীক্ষা (সি ট্রায়াল) সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের শেষের দিকে এটি অপারেটর কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হবে।
লেখা: সিরাজুর রহমান

