মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’ কয়েক বছর আগে থেকেই শনি গ্রহের বৃহত্তম উপগ্রহ টাইটান–এ প্রাণের সম্ভাবনা অনুসন্ধানের জন্য এক বৈপ্লবিক মিশন হাতে নিয়েছে। এই মিশনের নাম রাখা হয়েছে ‘ড্রাগনফ্লাই’, এবং যা হবে নিউক্লিয়ার এনার্জি চালিত আট রোটরবিশিষ্ট রোবটিক রোটরক্রাফট বা মহাকাশযান।
নাসার দীর্ঘ মেয়াদি এক পরিকল্পনা অনুযায়ী ‘ড্রাগনফ্লাই’ স্পেস–ক্রাফট আগামী ২০২৮ সালে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হবে এবং দীর্ঘ ছয় বছরের যাত্রা শেষে এটি ২০৩৪ সালে টাইটানের বুকে সরাসরি অবতরণ করবে। এরপর এটি প্রায় ৩.৩ বছর ব্যাপী টাইটানের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও অনুসন্ধানের কাজ চালিয়ে যাবে।
টাইটান হচ্ছে শনির সবচেয়ে বড় চাঁদ বা উপগ্রহ, যা পৃথিবী থেকে গড়ে প্রায় ১.২ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এর ব্যাস ২,৫৭৫ কিলোমিটার এবং সূর্যের আলো সেখানে পৌঁছাতে প্রায় ৮০ মিনিট সময় লাগে। এর পৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস –১৭৯.২°C (৯৪ কেলভিন) এবং সেখানে সূর্যের আলো পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ কম উজ্জ্বল হয়ে থাকে।
এছাড়া, টাইটান হচ্ছে আমাদের সোলার সিস্টেমের একমাত্র উপগ্রহ যার রয়েছে ঘন নাইট্রোজেন–সমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল। এছাড়া, ক্যাসিনি–হাইগেনস স্পেস মিশনের ডেটা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই উপগ্রহের পৃষ্ঠে তরল মিথেন ও ইথেনের নদী–হ্রদ রয়েছে নিশ্চিত হয়েছেন, এবং এর পৃষ্ঠের বরফের নিচে হয়তো বিশাল তরল জলের মহাসাগর লুকিয়ে থাকতে পারে।
এই অভাবনীয় এবং চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্যগুলোর কারনে বিজ্ঞানীরা টাইটানকে পৃথিবীর বাইরে প্রাণের টিকে থাকার উপযোগী এক সম্ভাব্য আবাসস্থল হিসেবে বিবেচনা করছেন। অতীতের ক্যাসিনি–হাইগেনস মিশন থেকে পাওয়া তথ্যও টাইটানের ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য ও সম্ভাব্য জীবনের ইঙ্গিতকে আরও জোরালো করে তুলেছে।
এটি নাসার একটি অতি উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট হলেও ‘ড্রাগবফ্লাই’ স্পেস–প্রোবটি আমেরিকার Johns Hopkins University Applied Physics Laboratory (APL) কর্তৃক ডিজাইন ও তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া, এই প্রজক্টের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩.৩৫ বিলিয়ন ডলার।
নাসার এই ‘ড্রাগনফ্লাই’ স্পেস মিশন টাইটানের বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে প্রায় ১১৫ কিলোমিটার (৭০ মাইল) পর্যন্ত ভ্রমণ করে ২০৩৪ সাল থেকে পরবর্তী ৩.৩ বছর পর্যন্ত উচ্চ রেজোল্যুশনের ক্যামেরা, স্পেকট্রোমিটার ও রাসায়নিক বিশ্লেষক যন্ত্রের মাধ্যমে প্রাক–জৈব অণু ও জীবনের উপযোগী উপাদান খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে।
এতে থাকবে উচ্চ প্রযুক্তির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন ব্যবস্থা, যা টাইটানের জটিল ভূখণ্ডে নিরাপদে উড্ডয়ন ও অবতরণ নিশ্চিত করবে। এর পাশাপাশি, এর ৮টি স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রিত রোটর ব্লেড, যা টাইটানের ঘন বায়ুমণ্ডলে স্থিতিশীলভাবে উড্ডয়ন করতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন প্রজেক্ট সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা।
শক্তি উৎপাদনের জন্য এতে ব্যবহার করা হচ্ছে Multi-Mission Radioisotope Thermoelectric Generator (MMRTG) প্রযুক্তি, যা প্লুটোনিয়ামের তাপ শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করে টাইটানের মতো অতি শীতল ও বরফ আচ্ছাদিত পরিবেশে আলোর উপস্থিতি ছাড়াও দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে সক্ষম।
বিজ্ঞানীদের মতে, যদি টাইটানে জটিল প্রাণ বা এলিয়েন লাইফের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় তবে তা হবে মানবজাতির ইতিহাসে অন্যতম চমকপ্রদ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। এই মিশন সফল হলে এই মিশন শুধু টাইটান নয়, বরং বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপা ও এনসেলাডাসের মতো অন্যান্য বরফ–আবৃত উপগ্রহে ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
পরিশেষে বলা যায়, নাসার ড্রাগনফ্লাই মিশন সফল হলে, তা হবে মানবজাতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক অর্জন। টাইটানের রহস্যময় পরিবেশে প্রাণের সম্ভাবনা যাচাই শুধু এই উপগ্রহ নয়, বরং পুরো সৌরজগতের অনুসন্ধানে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। যদি সেখানে জটিল প্রাণ বা এলিয়েন লাইফের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তবে তা হবে মানবজাতির এক অভাবনীয় আবিষ্কার।
লেখা: সিরাজুর রহমান

