ইরান যুদ্ধকে ঘিরে বাড়তে থাকা সংকটের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌবাহিনী পাঠাতে আহ্বান জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে ইউরোপীয় দেশগুলো। ব্রাসেলসে বৈঠকের পর ইইউ নেতারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই সংঘাতে সামরিকভাবে জড়ানোর কোনও ইচ্ছা তাদের নেই এবং কূটনৈতিক সমাধানকেই তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এতে করে পশ্চিমা জোটের ভেতরেও মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে। খবর আনাদোলু
ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শেষে সোমবার ইইউর পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কাল্লাস বলেন, সদস্য দেশগুলোর ‘ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপে জড়ানোর কোনও আগ্রহ নেই’ এবং ইউরোপ কোনও ‘অন্তহীন যুদ্ধে জড়াতে চায় না’।
তিনি আরও জানান, ইউরোপ মূলত সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারে মনোযোগ দিচ্ছে। তবে লোহিত সাগরে চলমান অপারেশন অ্যাসপিডেস এর মতো মিশন সম্প্রসারণ বা তা হরমুজ প্রণালিতে বিস্তারের বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তেমন আগ্রহ নেই।
কাল্লাস বলেন, কেউই এই যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে চায় না। ইউরোপের প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে সমুদ্রপথে চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো।
ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দেয়া ও জলদস্যু দমনের জন্য যে নৌ মিশনগুলো রয়েছে, সেগুলো হরমুজ প্রণালিতে পরিচালনার জন্য তৈরি করা হয়নি। তিনি বলেন, আমরা এসব মিশন জোরদার করতে রাজি আছি, তবে সেগুলো হরমুজ প্রণালিতে সম্প্রসারণ করা সম্ভব বলে মনে করি না।
জার্মানিও উপসাগরীয় অঞ্চলে বাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনা নাকচ করেছে। দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, বার্লিন ‘এ ধরনের পদক্ষেপ নেবে না’ এবং সংককটের দ্রুত রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।
জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্তোরিয়ুস সতর্ক করে বলেন, ন্যাটোর আওতার বাইরে বাহিনী মোতায়েন করতে হলে আইনি অনুমোদন ও পার্লামেন্টের সম্মতি প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের যুদ্ধ নয়; আমরা এটি শুরু করিনি। আমরা কূটনৈতিক সমাধান ও সংঘাতের দ্রুত অবসান চাই।’
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ব্রিটেন ‘বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে না’ এবং যে কোনও সামরিক মোতায়েনের জন্য আইনি বৈধতা থাকতে হবে।
পোল্যান্ড ও বেলজিয়ামও কূটনৈতিক সমাধান ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিয়ে ওয়াশিংটনের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে। পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি সমালোচনা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে ন্যাটোকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা হিসেবে তুলে ধরছেন, অন্যদিকে ইউরোপকে উপসাগরে সামরিক অভিযানে অংশ নিতে বলছেন। বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডে ভেভার পার্লামেন্টে বলেন, তার সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে কোনও আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নেবে না।
এর আগে সোমবার ট্রাম্প দাবি করেন, ‘অনেক দেশ’ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করতে প্রস্তুত। তবে তারা ইরানের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে- এই আশঙ্কায় দেশগুলোর নাম প্রকাশ করেননি তিনি।
এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার পর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালি অধিকাংশ জাহাজের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। এরপর থেকেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বাড়ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন হতো। এর ব্যাঘাত ঘটায় তেলের দাম বেড়েছে। এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিও রয়েছেন। পাল্টা হামলায় ইসরায়েল, জর্ডান, ইরাক ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে, অর্থাৎ যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা রয়েছে, সেগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান।

