প্রবাসের ব্যস্ত বহুমাত্রিক জীবনের মাঝেও বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও নাট্যচর্চাকে জীবন্ত রাখার অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করল ‘আঙ্গিক থিয়েটার সিডনি’। গত ৪ অক্টোবর (রোববার) সন্ধ্যায় সিডনির ব্রায়ান ব্রাউন অডিটোরিয়ামে মঞ্চস্থ হয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী নাটক ‘রক্তকরবী’-র ছায়া অবলম্বনে নির্মিত ব্যতিক্রমী নাট্য প্রযোজনা ‘Red Oleanders’। নির্দেশক রাহুল গাঙ্গুলীর ভাবনায় মূল নাটকের দর্শন অক্ষুণ্ণ রেখে কাহিনিকে কল্পনা করা হয়েছে ‘১০বিংশ শতাব্দীর ১০০ বছর পরের রক্তকরবী’ হিসেবে, যা প্রবাসী দর্শকদের গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে।
১৯২৪ সালে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ যক্ষপুরীর সোনা-কেন্দ্রিক লোভ, যান্ত্রিকতা ও মানবিক স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলে ধরেছিল। সিডনির মঞ্চে সেই শতবর্ষ পুরোনো রূপককে একুশ শতকের আধুনিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়। নাটকটির মূল আকর্ষণ ‘নন্দিনী’ চরিত্রে আফসানা রুচির সাবলীল অভিনয় ও বাচিক দক্ষতা দর্শকদের প্রশংসিত কুড়ায়। প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের মেলবন্ধনে টিম কিশোর, সায়ান রাহা, অপু সাহা, সুব্রত সরকার, তাসলিম আহমেদ বাপ্পি, অরিন্দম কাঞ্জিলাল ও অরিজিৎ বড়ুয়া শাওনসহ বেশ কয়েকজন উদীয়মান শিল্পী বিভিন্ন চরিত্রে নিখুঁত নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনাটির কারিগরি নির্দেশনাও ছিল অত্যন্ত পেশাদার। অরিজিৎ সেনের সেট ডিজাইন, প্রমিত চৌধুরী ও অরিন্দম ব্যানার্জীর আলো ও শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রজেকশনের সঠিক ব্যবহারে এক জীবন্ত আবহ তৈরি হয়। অমৃতা পাল চৌধুরী ও আকাঙ্ক্ষিতা চৌধুরীর নৃত্য ভাবনার পাশাপাশি রবীন্দ্রসঙ্গীত, লালন ও হাসন রাজার গানের সুনিপুণ সংযোজন নাটকটিতে ভিন্ন সাংস্কৃতিক মাত্রা যোগ করে।
প্রবাসের মাটিতে নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে রবীন্দ্রনাট্যের এমন আধুনিক রূপান্তর কেবল সাহিত্য চর্চাই নয়, বরং বাংলা সংস্কৃতির সুদূরপ্রসারী ধারাবাহিকতার এক উজ্জ্বল বার্তা। যন্ত্রসভ্যতা ও মানবিক মূল্যবোধের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই প্রযোজনা প্রমাণ করে—শত বছর পেরিয়েও রবীন্দ্রনাথের প্রশ্নগুলো আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

