ইউরোপের দেশ পর্তুগালের পার্লামেন্টে জনপরিসরে মুখ ঢেকে রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ‘বোরকা বিল’ চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পেয়েছে। শুক্রবার অনুষ্ঠিত এক উত্তপ্ত ভোটাভুটিতে ক্ষমতাসীন মধ্য-ডানপন্থী জোট, ডানপন্থী ও কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর সর্বাত্মক সমর্থনে বিলটি পাস হয়। এটি এখন পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হওয়ার জন্য কেবল দেশটির প্রেসিডেন্টের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট চাইলে এই বিলে স্বাক্ষর করতে পারেন, ভেটো দিয়ে তা বাতিল করতে পারেন অথবা সাংবিধানিক আদালতে পাঠিয়ে এর বৈধতা যাচাইয়ের আবেদন করতে পারেন।
এই খসড়া বিলটি প্রথম উত্থাপন করেছিল দেশটির কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘শেগা’। ২০২৫ সালের অক্টোবরে সংসদে বিলটির নীতিগত অনুমোদন মিললেও পরবর্তী সময়ে সংসদীয় কমিটিতে দীর্ঘ সময় এটি আটকে ছিল। এরপর চলতি বছরের জুনে ক্ষমতাসীন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিএসডি) বিলটির একটি সংশোধিত খসড়া উপস্থাপন করে। সেখানে ধর্মীয় পোশাককে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু না করে জননিরাপত্তা এবং পরিচয় শনাক্তকরণের বিষয়টিকে মূল যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। সেই সংশোধিত সংস্করণটিই এবার দেশটির সংসদে চূড়ান্তভাবে পাস হলো।
নতুন এই আইনের মাধ্যমে জনসমক্ষে এমন যেকোনো পোশাক বা আবরণ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা মানুষের মুখমণ্ডল পুরোপুরি ঢেকে দেয় এবং পরিচয় শনাক্তকরণে বাধা সৃষ্টি করে। এর আওতায় মুসলিম নারীদের ব্যবহৃত বোরকা ও নিকাব কার্যত নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছে। তবে স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন, পেশাগত নিরাপত্তা, ধর্মীয় উপাসনালয়, কূটনৈতিক স্থাপনা এবং বিমান ভ্রমণের মতো কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মুখ ঢেকে রাখার আইনি অনুমতি রাখা হয়েছে।
আইন অমান্যকারীদের জন্য কঠোর আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অবহেলাজনিত অপরাধের ক্ষেত্রে ২০০ থেকে ২,০০০ ইউরো এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আইন ভঙ্গ করলে ৪০০ থেকে ৪,০০০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে। এছাড়া কাউকে জোরপূর্বক মুখ ঢেকে রাখতে বাধ্য করলে আরও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। জরিমানার এই অঙ্ক নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে বিতর্ক হলেও সর্বশেষ অনুমোদিত পাঠে এই সীমাই বহাল রাখা হয়েছে।
বিলটি অনুমোদনের পর পর্তুগালে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও গভীর হতাশা দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই আইনটি কার্যত মুসলিম নারীদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত এবং এটি সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দেবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও এই বিলের তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, আইনটি ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত পোশাকের স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি। সংস্থাটি প্রেসিডেন্টকে এই বিলে স্বাক্ষর না করে সাংবিধানিক পর্যালোচনার জন্য আদালতে পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে, বিলটির সমর্থকদের দাবি, এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়নি; বরং জননিরাপত্তা, পরিচয় যাচাই এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ। প্রেসিডেন্টের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে পর্তুগালও ফ্রান্স, বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক ও সুইজারল্যান্ডের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোর কাতারে শামিল হবে, যেখানে জনপরিসরে মুখ ঢাকা রাখার ওপর ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মাত্রার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে।

