দীর্ঘ দুই দশকের রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে ফিলিস্তিনে সাধারণ সংসদীয় (আইনসভা) নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। আগামী ২৮ নভেম্বর এই ঐতিহাসিক ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস একটি বিশেষ ডিক্রি জারির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেন। অধিকৃত পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং গাজাসহ পুরো ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। যদি শেষ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক থাকে, তবে এটিই হবে দীর্ঘ ২০ বছরের মধ্যে ফিলিস্তিনের প্রথম সাধারণ নির্বাচন।
ফিলিস্তিনে সর্বশেষ সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৬ সালে। সেই নির্বাচনে ফাতাহ পার্টিকে আকস্মিকভাবে হারিয়ে বিপুল জয়লাভ করে হামাস। এর জের ধরে ২০০৭ সালে ফাতাহ ও হামাসের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয় এবং হামাস গাজা উপত্যকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্র জানায়, ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব এবং ফ্রান্স ও সৌদি আরবের মতো প্রভাবশালী বৈশ্বিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পরই এই নির্বাচনের সিদ্ধান্ত এসেছে। মূলত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে জরুরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার শর্ত হিসেবে দাতা দেশগুলো সেখানে বড় ধরনের শাসনতান্ত্রিক সংস্কার ও রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখতে চাচ্ছিল।
দীর্ঘদিন পর নির্বাচনের এই ঘোষণাকে বিশ্ববাসী স্বাগত জানালেও, বর্তমান বাস্তবতায় এটি সফলভাবে সম্পন্ন করা নিয়ে বড় ধরনের কিছু চ্যালেঞ্জ ও জটিলতা রয়ে গেছে। প্রথমত, অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের ভোট দেওয়ার অনুমতি ইসরায়েল দেবে কি না, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর আগে ২০২১ সালেও ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমে ভোটের নিশ্চয়তা না দেওয়ায় নির্বাচন বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিলেন মাহমুদ আব্বাস।
দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি হলো গাজা উপত্যকার বর্তমান পরিস্থিতি। সেখানে চলমান দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের কারণে ২১ লাখ বাসিন্দার প্রায় সবাই বাস্তুচ্যুত। গাজার ৯০ শতাংশেরও বেশি অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় সেখানে ভোট নেওয়ার মতো কোনো পরিবেশ বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অবশিষ্ট নেই। এমনকি যুদ্ধের কারণে ফিলিস্তিনের ভোটার তালিকাও সঠিকভাবে হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ২০০৫ সালে মাত্র ৪ বছরের মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু এরপর দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো নির্বাচন ছাড়াই তিনি ডিক্রি জারির মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রেখেছেন। এর ফলে দেশের ভেতরে ও বাইরে তাঁর বিরুদ্ধে নানা সমালোচনা তৈরি হয়েছে। মাহমুদ আব্বাস আগামী বছরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেরও একটি আভাস দিয়ে রেখেছেন, তবে তিনি নিজে পুনরায় প্রার্থী হবেন কি না তা পরিষ্কার করেননি। দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের মনে ভোটের প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকলেও, বর্তমান যুদ্ধ ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই নির্বাচন আদৌ মাঠে গড়াবে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ এখনও গভীরভাবে সন্দিহান।

