দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ক্রয়চুক্তির ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন এবং কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১২টি অত্যাধুনিক সাবমেরিন নির্মাণে জার্মানির খ্যাতনামা প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান টিকেএমএস-কে (থিসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস) বেছে নিয়েছে অটোয়া। মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের এই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে সামুদ্রিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি দেশীয় শিল্প ও প্রযুক্তি খাতকে শক্তিশালী করার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে দেশটির সরকার।
সোমবার (৬ জুলাই) কানাডার নোভা স্কশিয়ার হ্যালিফ্যাক্সে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই যুগান্তকারী ঘোষণা দেন। বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বর্তমান বিশ্ব ক্রমেই আরও বিপজ্জনক ও বিভক্ত হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় কানাডাকে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, অর্থনীতিকে শক্তিশালী এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে প্রস্তুত থাকতে হবে। সেই লক্ষ্যেই আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ক্রয়চুক্তি দ্রুত, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছি।”
কানাডা সরকার এখনো এই চুক্তির সম্ভাব্য ব্যয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি, তবে এটিকে দেশটির ইতিহাসের বৃহত্তম সামরিক ক্রয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জানা গেছে, এখনই টিকেএমএস-এর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু হবে, যা সম্পন্ন হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। প্রধানমন্ত্রী কার্নি জোর দিয়ে বলেন, এই প্রকল্প শুধু নতুন সাবমেরিন কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি কানাডার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা অবকাঠামো গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে কানাডিয়ান নৌবাহিনীর হাতে থাকা ভিক্টোরিয়া-শ্রেণির সাবমেরিন বহর অনেকটাই পুরোনো। ১৯৯৮ সালে কেনা এই সাবমেরিনগুলোর চারটির মধ্যে বর্তমানে মাত্র একটি সমুদ্রে পরিচালনার উপযোগী। বিশ্বের দীর্ঘতম উপকূলরেখার দেশ হওয়ায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলে নতুন সমুদ্রপথ উন্মুক্ত হওয়ায়, কানাডার নিরাপত্তা ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। এই নতুন সাবমেরিনগুলো বরফাচ্ছন্ন পানির নিচেও দীর্ঘ সময় অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম, যা আর্কটিক অঞ্চলে কানাডার সার্বভৌম উপস্থিতি নিশ্চিত করবে।
জার্মান প্রতিষ্ঠানটিকে এই দরপত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী ‘হানওয়া ওশিয়েন’-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে। টিকেএমএস জানিয়েছে, নরওয়ের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে দেওয়া তাদের এই প্রস্তাব কানাডাকে কম ঝুঁকিপূর্ণ, ন্যাটো-সমন্বিত এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক সমাধান দেবে। কানাডিয়ান গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের সভাপতি ডেভিড পেরি এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে বলেন, এর ফলে কানাডার সমুদ্র নিরাপত্তায় আমূল পরিবর্তন আসবে এবং ভবিষ্যতে একই সময়ে অন্তত তিনটি সাবমেরিন সক্রিয় রাখা সম্ভব হবে। ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের আগমুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী কার্নির এই ঘোষণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি ইতিমধ্যে কানাডার প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করেছেন এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।

