পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার বারুইপুরে ১১ বছর বয়সী এক মুসলিম কিশোরীকে পাশবিক গণধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সমগ্র রাজ্যজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই বর্বরতার শিকার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে যাওয়ার পথে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূলের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যাতে বারুইপুরে যেতে না পারেন, সেজন্য কলকাতার কালীঘাটের বাসভবনের সামনে আচমকাই বিপুল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে তাকে অঘোষিতভাবে ‘গৃহবন্দী’ করে রেখেছে বর্তমান বিজেপি সরকার।
রবিবার (৫ জুলাই) গভীর রাতে কালীঘাটের বাড়ি ব্যারিকেড দিয়ে অবরুদ্ধ করার পর এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “বারুইপুরের ঘটনাটি অত্যন্ত নির্মম ও বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে। সাধারণ মানুষ আর এই বর্বরতা সহ্য করতে পারছে না। অথচ আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও, কার্যত গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে।” তবে সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। অন্যদিকে, এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন সরকারি মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। তিনি দাবি করেন, সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর জেড-প্লাস ক্যাটাগরির সুরক্ষার অংশ হিসেবেই এই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এই তীব্র পুলিশি ঘেরাটোপের মধ্যেই রাজপথে নেমে আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বারুইপুরের ঘটনার প্রতিবাদে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে তিনি মোমবাতি হাতে এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দেন। হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে আয়োজিত এই মিছিলে সংসদ সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন ও প্রতিমা মণ্ডল অংশ নেন। তৃণমূলের দাবি, শান্তিপূর্ণ মিছিলে বাধা দিয়ে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজের রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।
এদিকে সোমবার (৬ জুলাই) প্রকাশিত প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্টে শিশুটির ওপর চালানো বর্বরতার লোমহর্ষক চিত্র উঠে এসেছে। রিপোর্টে জানা গেছে, নিখোঁজ শিশুটির শরীরের বিভিন্ন অংশে কামড় ও আঁচড়ের দাগ এবং গোপন অঙ্গে মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কোনো ভারী বস্তু দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়েছিল। আরও ভয়ানক তথ্য হলো, শিশুটিকে যখন বস্তাবদ্ধী করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়, তখনো তার প্রাণ ছিল এবং পানিতে ডোবার কারণে তার ফুসফুস ও পাকস্থলীতে পানি পাওয়া গেছে। এই পৈশাচিক খবর ছড়িয়ে পড়তেই বারুইপুর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে ইন্দ্রজিৎ তাঁতি (পিন্টু) নামে এক অভিযুক্ত অটোচালকের মৃত্যু হয়েছে।
জনগণের তীব্র ক্ষোভের মুখে প্রশাসন এই ঘটনার মূল হোতা আনন্দ সর্দারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ঘটনা তদন্তে ৬ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত দল (SIT) গঠন করা হয়েছে। নিহত কিশোরীর অসহায় পিতা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অপরাধীদের প্রকাশ্য দিবালোকে ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন এবং প্রশাসন তাকে সর্বোচ্চ শাস্তির আশ্বাস দিয়েছে। এই নৃশংস ঘটনার পর ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা এবং ঘটনার সাথে যুক্ত স্থানীয় বিজেপি নেতাকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

