মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যে দুই দিনের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর লেবাননে আবারও নতুন করে রক্তপাত ঘটেছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সৈন্যদের মেশিনগানের গুলিতে দুইজন নিহত এবং আরও দুইজন আহত হয়েছেন। গত তিন দিনের মধ্যে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে এটিই প্রথম মৃত্যুর ঘটনা, যা কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে।
লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এই ঘটনাকে একটি ‘বিশ্বাসঘাতক হামলা’ এবং যুদ্ধবিরতির ‘প্রকাশ্য’ লঙ্ঘন বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তবে এই হামলার জবাবে তারা কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেবে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট করেনি। স্থানীয় সূত্রমতে, দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়া শহরের নিকটবর্তী একটি এলাকায় রাস্তা পরিষ্কার করার কাজে নিয়োজিত একটি খননযন্ত্রের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মানুষকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলি সৈন্যরা হঠাৎ মেশিনগান দিয়ে গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই দুই ব্যক্তি নিহত হন।
এই হামলার সপক্ষে যুক্তি দিয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা দক্ষিণ লেবাননের ‘আলি আল-তাহের শৈলশিরা’ এলাকায় মোতায়েন থাকা ইসরায়েলি সৈন্যদের জন্য ‘তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টিকারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের’ ওপর এই হামলা চালিয়েছে। উল্লেখ্য, এই অঞ্চলটি দক্ষিণ লেবাননের এমন একটি এলাকার মধ্যে অবস্থিত, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনী এককভাবে একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ ঘোষণা করে রেখেছে। হামলার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী এক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের সৈন্য ও নাগরিকদের বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকি নিষ্ক্রিয় করার জন্য দৃঢ়তার সাথে কাজ করে যাবে।
এদিকে, ইসরায়েলের এই আগ্রাসী অবস্থানের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক পরিষদের পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলে হিজবুল্লাহ তার উপযুক্ত জবাব দেবে। তারা বর্তমানে ট্রিগারে আঙুল রেখে সম্পূর্ণ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং যেকোনো ধরনের হামলার মোকাবিলা করতে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের এই হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়বদ্ধ করেছেন। এমন এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে মার্কিন মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনার একটি নতুন পর্ব শুরু হতে চলেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় লেবানন দেশটির দক্ষিণাঞ্চল থেকে সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার চাইছে। অপরদিকে, ইসরায়েল দাবি করছে তারা হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ ‘নিরস্ত্রীকরণ’ চায়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লেবাননে চলমান ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৪,১০৬ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ১২ লাখের বেশি মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন। যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও মাঠপর্যায়ে লেবাননের সাধারণ বাসিন্দাদের মনে এখনো তীব্র সংশয় ও অবিশ্বাস কাজ করছে। বাস্তুচ্যুত সাধারণ মানুষরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, তারা এই যুদ্ধবিরতিকে মোটেও বিশ্বাস করেন না; কারণ ইসরায়েল বারবার যুদ্ধবিরতির কথা বলে নতুন করে হামলা শুরু করে।

