প্রধান খবর

বিএসএফের পুশ ইনের চেষ্টা: নো-ম্যানস ল্যান্ডে কোলের শিশুসহ ৯ বাংলাদেশি জিম্মি

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া ও ভন্দুরচর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশ ইনের শিকার হয়ে খোলা আকাশের নিচে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন শিশু ও নারীসহ ৯ বাংলাদেশি। গত তিন দিন ধরে তীব্র গরম, অনাহার আর অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডের শূন্যরেখায় দিন কাটছে তাদের। এই সংকট নিরসনে বিজিবি-বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও ভারতের একগুঁয়েমির কারণে কোনো সমাধান ছাড়াই তা ব্যর্থ হয়েছে।

সীমান্ত সূত্রে জানা গেছে, পুশ ইনের শিকার ব্যক্তিরা নিজেদের বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুল গ্রামের বাসিন্দা বলে দাবি করেছেন। ভুক্তভোগীদের একজন সুমি আক্তার অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে জানান, মাত্র ২৭ দিন আগে কাজের সন্ধানে সিলেট সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন তারা। সেখানে পৌঁছানোর পর ভারতীয় পুলিশ তাদের আটক করে বিএসএফের হাতে তুলে দেয়। এরপর বিএসএফ তাদের জোরপূর্বক পুশ ইনের চেষ্টা চালায়।

গত তিন দিন ধরে ৬ মাসের ও ৪ বছরের দুটি অবুঝসন্তান নিয়ে নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে আছেন সুমি। তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, “এই প্রচণ্ড গরমের মধ্যে আমরা এখানে পইড়া আছি। খাবার নাই, পানি নাই, মাথার ওপর ছাদ নাই। বাচ্চারা ক্ষুধার জ্বালায় অনবরত কান্নাকাটি করছে। স্থানীয়রা দয়া করে কিছু বিস্কুট আর রুটি দিচ্ছে, তা দিয়েই কোনোমতে ক্ষুধা মেটাচ্ছি।” সুমির স্বামী বেলালও নিজের ভুল স্বীকার করে বলেন, “জীবনে অনেক বড় ভুল করছি, আর কোনোদিন এই কাজ করব না। অন্তত বাচ্চা দুটোর মুখের দিকে তাকিয়ে আমাদের বাঁচান।”

“টানা তিন দিন ধরে ৬ মাসের এক দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ দুটি বাচ্চাকে এভাবে খোলা আকাশে আটকে রাখায় হতবাক ও ক্ষুব্ধ সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষ।”

এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রোববার (১৪ জুন) সকালে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে এক জরুরি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিজিবি অবৈধ পুশ ইনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে শূন্যরেখায় আটকে থাকা ৯ নাগরিককে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানায়। তবে বিএসএফ পুশ ইনের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করায় দীর্ঘ আলোচনার পরও বৈঠকটি কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই ব্যর্থ হয়। তিন দিন পেরিয়ে গেলেও বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

স্থানীয় শৌলমারী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য সোনা মিয়া এবং গয়টাপাড়ার বাসিন্দা ছক্কু মিয়া জানান, কোলের বাচ্চাদের নিয়ে পরিবারগুলো চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। একদিকে দিনের বেলা তীব্র গরম ও রোদ-বৃষ্টি, অন্যদিকে রাতের অন্ধকারে সাপ-বিচ্ছু ও মশার কামড়ে বাচ্চাগুলো গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। উপরন্তু সেখানে টয়লেটের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় নারীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। মানবিক কারণে দ্রুত এর স্থায়ী সমাধান হওয়া জরুরি, অন্যথায় শিশুদের বড় ধরনের বিপদ হতে পারে।

এদিকে পুশ ইনের খবর ছড়িয়ে পড়লে ৬ মাসের শিশুসহ আটকে পড়াদের দেখতে বাংলাদেশ সীমান্তের অভ্যন্তরে ভিড় জমাচ্ছেন শত শত উৎসুক জনতা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গয়টাপাড়া ও ভন্দুরচরসহ রৌমারী উপজেলার পুরো সীমান্ত এলাকায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সীমান্তবাসীদের সাথে নিয়ে বিজিবির টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

গয়টাপাড়া বিওপি ক্যাম্পের হাবিলদার মাসুদ রানা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, রোববার সকাল ৭টার দিকে গয়টাপাড়া সীমান্ত দিয়ে ৬ জন এবং ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে ৩ যুবককে পুশ ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি ও স্থানীয়দের তীব্র বাধার মুখে তারা সীমান্তের শূন্যরেখা লাগোয়া ভারতের অংশের কাঁটাতারের বাইরে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়।

জামালপুর ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, “বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পর্যায়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলছে। অসহায় নাগরিকদের এই সংকট থেকে মুক্ত করতে আমরা দ্রুত ও কূটনৈতিক সমাধানের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *