আফ্রিকার কঙ্গো ও উগান্ডাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের একটি বিরল ও মারাত্মক স্ট্রেন ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে তীব্র আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সুনির্দিষ্ট কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা কার্যকর চিকিৎসা না থাকায় মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআরসি) উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশেই এখন পর্যন্ত ২২৩ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সংক্রমণ ঠেকানো এবং আক্রান্তদের জরুরি চিকিৎসার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জোর আহ্বান জানিয়েছে।
এবারের প্রাদুর্ভাবে ইবোলার অত্যন্ত বিরল ও মারাত্মক ‘বুন্দিবুগিও’ (Bundibugyo) নামক স্ট্রেনটি শনাক্ত হয়েছে, যা কঙ্গোর সীমানা পেরিয়ে ইতিমধ্যে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উগান্ডায় এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এই নির্দিষ্ট স্ট্রেনের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো কোনো অনুমোদিত প্রতিষেধক না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে।
সংক্রমণ রোধে উগান্ডা সরকার কঙ্গোর সাথে তাদের সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তীব্র বিরোধিতা করে একে ‘অনর্থক’ বলে আখ্যায়িত করেছে। ডব্লিউএইচও-এর মতে, সীমান্ত বন্ধ করলেই ভাইরাস আটকানো যায় না, বরং এতে জরুরি মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে, মহামারি কবলিত এলাকা থেকে আক্রান্ত বা সংক্রমিত মার্কিন নাগরিকদের চিকিৎসার লক্ষ্যে কেনিয়াতে ৫০ শয্যার একটি কোয়ারেন্টাইন সেন্টার খোলার পরিকল্পনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে কেনিয়ার উচ্চ আদালত মার্কিন অর্থায়নে নির্মিতব্য এই ইবোলা আইসোলেশন সেন্টারের কার্যক্রমের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কেনিয়ার মানবাধিকার সংস্থা ‘কাতিবা ইনস্টিটিউট’ এবং চিকিৎসকদের বৃহত্তম ইউনিয়ন ‘কেএমপিডিইউ’ (KMPDU) সরকারের এই গোপন চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে একে দেশের বায়োসিকিউরিটির (জৈব নিরাপত্তা) জন্য বড় হুমকি বলে উল্লেখ করেছে। কেনিয়ার চিকিৎসকরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “যে ভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক, তা কেনিয়ার জনগণের জন্যও সমান বিপজ্জনক।”
উল্লেখ্য, গত তিন দশক ধরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতায় জর্জরিত কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশে ইবোলার প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সেখানে চলমান সংঘাতের কারণে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি সশরীরে পরিদর্শন করতে কঙ্গোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ছুটে গেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুস। তিনি আক্রান্তদের পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি টিকাদান ও চিকিৎসা কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে সব যুদ্ধরত পক্ষকে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয়দের ক্ষোভ। কঠোর চিকিৎসাবিধি এবং ঐতিহ্যবাহী দাফন প্রক্রিয়ায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ ক্ষুব্ধ হয়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাচ্ছে।
এই চরম মানবিক সংকটের মুখে কঙ্গোর রেড ক্রস সোসাইটি, আইএফআরসি (IFRC) এবং আইসিআরসি’র (ICRC) যৌথ সহায়তায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে মাঠে নামানো হয়েছে। এই স্বেচ্ছাসেবকরা ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম (PPE) পরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ দাফন সম্পন্ন করছেন। একই সঙ্গে তারা বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবিরগুলোতে ইবোলার লক্ষণ, প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং দ্রুত স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগাযোগ করার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন।

