দীর্ঘ ২১ বছরের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে তাঁর পথচলা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট, হাঙ্গেরির বিপক্ষে। সেবার ১৮ বছরের তরুণ মেসি বদলি হিসেবে নেমে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। তবে সেই অস্বস্তিকর সূচনা অতিক্রম করে বিশ্বমঞ্চে ফুটবল রূপকথার এক অনবদ্য ইতিহাস রচনা করেছেন তিনি। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, শত শত গোল এবং অসংখ্য অভাবনীয় পারফরম্যান্সে আলবিসেলেস্তেদের ফুটবলে তিনি হয়ে উঠেছেন মহাকাব্যিক এক নাম।
সম্প্রতি বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের রোমাঞ্চকর জয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অধ্যায় টেনেছেন ৩৮ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি। নিজের শেষ ম্যাচেও একটি অনবদ্য গোল ও দুটি দৃষ্টিনন্দন অ্যাসিস্ট করে রাতটিকে স্মরণীয় করে রাখেন তিনি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০৮ ম্যাচে ১২৬টি গোল করে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড নিয়ে বিদায় নিলেন তিনি। তবে সংখ্যা দিয়ে মেসির এই অর্জনকে পরিমাপ করা অসম্ভব। জাতীয় দলের হয়ে তাঁর ২১ বছরের ক্যারিয়ারে বহু স্মৃতি তৈরি হলেও, সেরা ১০টি মুহূর্ত ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।
প্রথমত, ২০০৬ বিশ্বকাপে সার্বিয়ার বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচেই মাত্র ১৬ মিনিটে গোল ও অ্যাসিস্ট করে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দেন তিনি। দ্বিতীয়ত, ২০১২ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে ৪-৩ ব্যবধানে জয় এনে দেন, যার শেষ গোলটি ছিল মাঝমাঠ থেকে এক একক দৌড়ে করা অবিশ্বাস্য শট। তৃতীয়ত, ২০১৮ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে বাদ পড়ার শঙ্কায় থাকা আর্জেন্টিনাকে ইকুয়েডরের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে সরাসরি বিশ্বকাপে পৌঁছান মেসি। চতুর্থত, একের পর এক ফাইনাল হার ও নানা সমালোচনার পর ২০২১ কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটান। পঞ্চমত, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে হারের পর মেক্সিকোর বিপক্ষে তাঁর দুর্দান্ত দূরপাল্লার গোলটিই দলকে নতুন জীবন এনে দেয়।
ষষ্ঠত, কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তরুণ ডিফেন্ডার জোস্কো গভার্দিওলকে পরাস্ত করে জুলিয়ান আলভারেজকে দিয়ে গোল করানো ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন। সপ্তম মুহূর্তটি ছিল নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে নাটকীয় ‘ব্যাটল অব লুসাইল’, যেখানে তাঁর অবিশ্বাস্য অ্যাসিস্ট ও পেনাল্টি গোল ম্যাচ জয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়। অষ্টম ও সবচেয়ে বড় অর্জনটি আসে ১৮ ডিসেম্বর ২০২২-এ; ফ্রান্সকে হারিয়ে কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন মেসি, যেখানে টুর্নামেন্টের প্রতিটি নকআউট ধাপে ম্যাচসেরা হন তিনি। নবমত, ২০২৬ বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সে ৮টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট করে দলকে ফাইনালে তুলে প্রমাণ করেন বড় মঞ্চে তাঁর জাদু অমলিন। পরিশেষে, নিজের শেষ বিদায়ী ম্যাচে বেনিনের বিপক্ষে গোল ও অ্যাসিস্টের পর চোখের জলে আন্তর্জাতিক আঙিনাকে বিদায় জানান এই মহানায়ক।
একসময় জাতীয় দলের হয়ে বড় শিরোপা না পাওয়ার যে আক্ষেপ ছিল, বিদায়বেলায় তা পরিণত হয়েছে পূর্ণতায়। একটি বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা ও একটি ফিনালিসিমা জয় করে নীল-সাদা ১০ নম্বর জার্সির এক সোনালী যুগের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন লিওনেল মেসি।

