গিটার হাতে ঘরছাড়ার এক রোমাঞ্চকর গল্প দিয়ে যাঁর পথচলা শুরু হয়েছিল, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলা রকসংগীতের একচ্ছত্র সম্রাট-‘গুরু’ খ্যাত জেমস। চট্টগ্রাম শহরের আজিজ বোর্ডিং থেকে শুরু হওয়া সেই তরুণ স্বপ্নবাজের যাত্রা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে আকাশছোঁয়া খ্যাতির শিখরে। শুক্রবার (২ অক্টোবর) ৬১ বছর পূর্ণ করে ৬২ বছরে পা রাখলেন নগর বাউল খ্যাত এই অনন্য সংগীত তারকা। নওগাঁয় জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর সংগীতে হাতেখড়ি ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামেই।
ব্যান্ড সংগীতের প্রতি প্রবল অনুরাগের কারণে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই পরিবারের সাথে অভিমান করে ঘর ছেড়েছিলেন ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস। আজিজ বোর্ডিংকে আশ্রয় বানিয়ে বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন বিখ্যাত ব্যান্ড ‘ফিলিংস’। বাবরি দোলানো ঝাঁকড়া চুল, হাতে গিটার আর চিরচেনা কণ্ঠের একক বৈশিষ্ট্যে ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা সংগীত জগতের মহীরূহ, ভক্তদের হৃদয়ের পরম শ্রদ্ধেয় ‘গুরু’।
নিজের জন্মদিনে ঘটা করে কোনো আনুষ্ঠানিকতা পছন্দ না করলেও বিশেষ সময় কাটাতে রাজধানীর পূর্বাচলে এক ক্লাবে নিভৃত সময় পার করেন জেমস। সেখানে গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে গান, নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং শিল্পের আবেগ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন এই রকস্টার। বর্তমানে গান শোনার অভ্যাস বদলে যাওয়া ও প্রযুক্তির প্রভাবে শ্রোতাদের মনোযোগ কমে আসা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, গান এখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে নিখরচায় সহজলভ্য হওয়ায় মানুষের গভীর মনোযোগ কমে গেছে; এমনকি একটি পূর্ণাঙ্গ ট্র্যাক শোনার ধৈর্যও হারিয়ে যাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির বিবর্তন প্রসঙ্গে জেমস বলেন, পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা উচিত। আবেগ ও ব্যাকুল ভালোবাসা থেকে সংগীত সৃষ্টি না করে বাণিজ্যিক লাভের হিসাব কষলে শিল্পীকে দিনশেষে হতাশ হতে হয়। তবে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা ভালো সৃষ্টিশীল কাজের জন্য এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে তাতে কোনো অসঙ্গতি দেখেন না তিনি।
সংস্কৃতিকে নদীর গতিপথের সাথে তুলনা করে এই বর্ষীয়ান সংগীতশিল্পী জানান, গান হলো মানুষের অনুভূতি ও আনন্দ প্রকাশের স্বাধীন মাধ্যম। মানুষ নদীর ঘাটে কিংবা বাজারে-যেখানেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে, সেখানেই গাইবে; এতে বাধা দেওয়া অনুচিত। সমাজ বদলানো বা বড় কোনো বিপ্লবের উদ্দেশ্যে নয়, বরং একজন খাঁটি বিনোদনকর্মী হিসেবে মানুষকে নিখাদ আনন্দ দেওয়াই তাঁর মূল লক্ষ্য। সবাই নিজ অবস্থান থেকে চারপাশের শুভচেতনা ছড়িয়ে দিলে সমাজের সার্বিক কল্যাণ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অর্জিত হবে বলে মনে করেন তিনি।

