সন্তানদের মানুষ করতে নিজের সমস্ত সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছিলেন এক দুর্ভাগা পিতা। জীবনের শেষভাগে এসে সেই চার সন্তানের কাউকেই পাশে পেলেন না তিনি। দীর্ঘ রোগভোগ, যন্ত্রণা আর নিঃসঙ্গতার সঙ্গে লড়াই শেষে ওপারে পাড়ি দিলেও শেষবার বাবাকে একটু ছুঁয়ে দেখতেও আসেনি কোনো সন্তান। তবে শেষকৃত্যে অনুপস্থিত থাকলেও পিতার ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ হাতাতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে তারা। হৃদয়বিদারক ও নির্মম এই ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে।
জানা যায়, ইন্দোরের বাসিন্দা ঘনশ্যাম সাইকেলের টায়ার-টিউবের একটি ছোট্ট ব্যবসা করতেন। ছোট চার সন্তানকে রেখে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। একা হাতেই চার সন্তানকে বড় করে তোলেন। এমনকি নিজের শেষ সম্বল বলতে থাকা বাড়িটি বিক্রি করে সেই অর্থ চার সন্তানের মধ্যে ভাগ করে দেন। কিন্তু সম্পত্তি হাতে পাওয়ার পর সন্তানরা একে একে বাবার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। জ্যেষ্ঠ বয়সে তাকে গৃহহীন করে দূর দূরান্তে ফেলে রাখা হয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ভোপালের একটি বাস টার্মিনালে পড়ে থাকতে দেখে কয়েকজন তরুণ সমাজকর্মী তাকে উদ্ধার করে ‘আপনা ঘর’ নামের একটি বৃদ্ধাশ্রমে পৌঁছে দেন।
বৃদ্ধাশ্রমের পরিচালক মাধুরী মিশ্র জানান, শেষ চার বছর ধরে অবশ ও অসুস্থ শরীর নিয়ে সেখানেই দিন কেটেছে ঘনশ্যামের। সেখানে থাকাকালে তার ডায়েরিতে থাকা নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও সন্তানরা সাফ জানিয়ে দেয়, সম্পত্তি ভাগ হয়ে যাওয়ার পর বাবার সঙ্গে তাদের আর কোনো লেনদেন বা সম্পর্ক নেই।
গত ৪ আগস্ট ৭০ বছর বয়সে চিরবিদায় নেন ঘনশ্যাম। মৃত্যুর খবর পেয়েও সন্তানরা নানা অজুহাতে শেষকৃত্যে আসতে অস্বীকার করে। এক মেয়ে অভিযোগ তোলেন, সম্পত্তি ছেলেদের বেশি দেওয়া হয়েছে, তাই তিনি আসবেন না। অন্যদিকে ছেলেরা দাবি করে, বাবা তাদের জন্য তেমন কিছুই করেননি। আশ্রম কর্তৃপক্ষের দুই দিনের দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে পুলিশের সহায়তায় তারাই শেষকৃত্য সম্পন্ন করে।
তবে দাফন-কাফন ও শেষ বিদায়ে না এলেও সন্তানরা এখন পিতার ডেথ সার্টিফিকেট বা মৃত্যুসনদ নিজেদের দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই প্রসঙ্গে বৃদ্ধাশ্রমের পরিচালক মাধুরী মিশ্র দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, যে সন্তানরা জীবিত অবস্থায় বাবার খবর নেয়নি এবং মৃত্যুর পরও মুখ দেখতে আসেনি, তাদের হাতে কোনো অবস্থাতেই এই সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া হবে না। জীবনের শেষ মুহূর্তে পাশে না থাকা পাষাণ সন্তানদের এমন নিষ্ঠুর আচরণ সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবিকতার চরম অবক্ষয়কেই স্পষ্ট করে তুলেছে।

