ফেসবুকের প্রেমে সাড়া দিয়ে দূর দেশ থেকে ছুটে এসেছিলেন প্রেমিকার টানে। কিন্তু সেই ভালোবাসার চরম ও করুণ পরিণতি প্রত্যক্ষ করল সীমান্ত এলাকা। অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ার পর গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে আইনি বেড়াজাল ও পরিবারের চরম অনাগ্রহের কারণে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের হিমঘরে নিঃসঙ্গভাবে পড়ে আছে প্রবীর মণ্ডল (৪০) নামের এক ভারতীয় নাগরিকের মৃতদেহ। এত দীর্ঘ সময় পার হলেও লালফিতার দৌরাত্ম্যে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর বা দাফনের কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নিমচা এলাকার বাসিন্দা মহাদেব মণ্ডলের ছেলে প্রবীর মণ্ডলের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয় বাংলাদেশের এক তরুণীর। সময়ের ব্যবধানে সেই পরিচয় রূপ নেয় গভীর প্রেমে। ভালোবাসার টানে ২০২১ সালের নভেম্বরে প্রবীর অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম সীমান্ত এলাকায় প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। কিন্তু সেখানে অবস্থানকালেই হঠাৎ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় এবং ২০২১ সালের ১০ নভেম্বর একটি মেডিকেল লিগ্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। সেই থেকে অদ্যাবধি লাশটি হাসপাতালের হিমঘরেই সংরক্ষিত রয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরেই লালমনিরহাট জেলা পুলিশ থেকে জানানো হয়েছিল লাভে পচন ধরার কথা। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবির) মাধ্যমে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সাথে একাধিক পতাকা বৈঠক করে মরদেহ হস্তান্তরের সুপারিশ করা হলেও কোনো সুরাহা হয়নি।
পুলিশি তদন্তে প্রবীরের পোশাক থেকে একটি ভারতীয় পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়। پاسপোের্ট দেখা যায়, তিনি অতীতেও বৈধ ভিসায় বাংলাদেশে এসেছিলেন। তবে মৃত্যুর সময় তার এই অনুপ্রবেশ ছিল অবৈধ। মৃত্যুর পরপরই ভারতের পশ্চিমবঙ্গে থাকা প্রবীরের পরিবার ও তার ছোট ভাই সুবীর মণ্ডলের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু আইনি ঝামেলা এবং পরিবারের চরম অনাগ্রহের কারণে তারা মরদেহ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে পাটগ্রাম থানায় অপমৃত্যুর মামলা হলেও তার আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে মর্গে একটি লাশের এভাবে পড়ে থাকা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বিষয়ে রংপুরের জেলা প্রশাসক রুহুল আমীন জানান, যেহেতু পরিবারের আগ্রহ নেই এবং আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়াও থমকে আছে, তাই বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করে ধর্মীয় ও আইনি বিধি মোতাবেক মরদেহটির দাফন বা শেষকৃত্যের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

