পর্বতজয়ের নেশায় আরও একবার বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ালেন বাবর আলী। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বের পঞ্চম উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ ‘মাকালু’ আরোহণ করে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তিনি। এই অভাবনীয় অর্জনের মধ্য দিয়ে বাবর আলী বিশ্বের আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার ছয়টি পর্বত সফলভাবে আরোহণের বিরল রেকর্ড গড়লেন, যা এখন পর্যন্ত অন্য কোনো বাংলাদেশির নেই।
শনিবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে বাবর আলী সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮ হাজার ৪৮৫ মিটার উচ্চতার এই বিপজ্জনক শৃঙ্গের চূড়ায় পা রাখেন। নেপালি সংস্থা ‘মাকালু অ্যাডভেঞ্চার’-এর বরাত দিয়ে চট্টগ্রামের পর্বতারোহণ ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’-এর সভাপতি ফারহান জামান এই সাফল্যের খবরটি নিশ্চিত করেছেন। ঐতিহাসিক এই মুহূর্তটিতে বাবর আলীর সঙ্গে ছিলেন অভিজ্ঞ শেরপা পর্বতারোহী আং কামি শেরপা।
পেশায় চিকিৎসক বাবর আলী গত ৭ এপ্রিল মাকালু অভিযানের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করেন। ৯ এপ্রিল নেপালের টুমলিংটারে পৌঁছানোর পর তিনি বেস ক্যাম্পে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। আবহাওয়া অনুকূলে আসায় গত ৩০ এপ্রিল তিনি চূড়ান্ত আরোহণ শুরু করেন এবং সরাসরি ক্যাম্প-২-এ পৌঁছান। এরপর ১ মে দিবাগত মধ্যরাতে ক্যাম্প-৩ থেকে যাত্রা শুরু করে ১ হাজার ১০০ মিটারের বিপজ্জনক ও খাড়া বরফ পথ পাড়ি দিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি মাকালুর শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হন। অভিযান সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বর্তমানে তিনি অবতরণ শুরু করেছেন এবং আশা করা হচ্ছে ৩ মে’র মধ্যে নিরাপদে বেস ক্যাম্পে ফিরে আসবেন।
২০১৪ সালে পর্বতারোহণ শুরু করা বাবর আলীর এই গৌরবময় যাত্রার পেছনে রয়েছে এক দশকের কঠোর পরিশ্রম ও একাগ্রতা। তিনি চট্টগ্রামের জনপ্রিয় পর্বতারোহণ ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৭ সালে ভারতের নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে মৌলিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর থেকেই তিনি হিমালয়ের একের পর এক কঠিন শৃঙ্গে অভিযান চালিয়ে আসছেন। ২০২২ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অত্যন্ত প্রযুক্তিগত ও কঠিন পর্বত ‘আমা দাবলাম’ আরোহণের মাধ্যমে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনায় আসেন।
এরপর ২০২৪ সালে একই অভিযানে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ‘মাউন্ট এভারেস্ট’ ও চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ‘লোৎসে’ আরোহণ করে ইতিহাস গড়েন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে তিনি ‘অন্নপূর্ণা-১’ জয় করেন এবং একই বছরের সেপ্টেম্বরে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে কোনো কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই ‘মাউন্ট মানাসলু’র চূড়ায় পা রেখে রেকর্ড গড়েন। বিশ্বের ১৪টি আট হাজারি শৃঙ্গ জয়ের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাবর আলী স্থির করেছেন, মাকালু জয় সেই অভিযানের পথে তাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।

