প্রধান খবর

অ্যান্ডোরা : ইউরোপের এক টুকরো স্বর্গ

বর্তমানে, দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপের ক্ষুদ্র স্থলবেষ্টিত দেশ ‘অ্যান্ডোরা’ বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও কম অপরাধপ্রবণ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। নামবিও (Numbeo) গ্লোবাল সেফটি ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, নিরাপদ ও কম অপরাধপ্রবণ দেশ হিসেবে অ্যান্ডোরা ১৫০টি দেশের মধ্যে ৮৪.৮ স্কোর অর্জন করে তৃতীয় স্থানে রয়েছে।

যদিও Numbeo Safety Index 2025 অ্যান্ডোরা গত ২০২৫ সালে প্রথম স্থানে ছিল। তবে, চলতি ২০২৬ সালে এসে একই ৮৪.৮ স্কোর নিয়ে কাতার দ্বিতীয় স্থানে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ৮৬ পয়েন্ট নিয়ে এই র‍্যাংকিং-এ প্রথম স্থানে রয়েছে। এছাড়া, নিরাপদ দেশের তালিকায় মাত্র ১৯ স্কোর নিয়ে পাপুয়া নিউ গিনিয়া রয়েছে একেবারে তলানিতে ১৫০ তম স্থানে।

ইউরোপের পিরিনীয় পর্বতমালায় অবস্থিত অ্যান্ডোরার আয়তন মাত্র ৪৬৭.৬ বর্গকিলোমিটার এবং ওয়ার্ল্ডোমিটারের সর্বশেষ জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ মার্চ ২০২৬ তারিখে অ্যান্ডোরার জনসংখ্যা হচ্ছে ৮৩,৫৯৮ জন। এছাড়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য না হয়েও দেশটি নিজস্ব কারেন্সি হিসেবে ইউরো ব্যবহার করে।

উত্তরে ফ্রান্স এবং দক্ষিণে স্পেন দ্বারা সীমাবদ্ধ এই দেশের রাজধানী অ্যান্ডোরা লা ভেলিয়া, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,০২৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এবং ইউরোপের সর্বোচ্চ রাজধানী শহর হিসেবে পরিচিত। রুক্ষ পাহাড়, গভীর উপত্যকা ও তুষারাবৃত শৃঙ্গ দেশটিকে করেছে অপূর্ব সুন্দর। শীতে প্রচুর তুষারপাত হলেও গ্রীষ্মে আবহাওয়া থাকে শীতল, শুষ্ক ও রৌদ্রোজ্জ্বল।

বিশ্বে একমাত্র কো-প্রিন্সিপালিটি শাসন ব্যবস্থা অ্যান্ডোরায় বিদ্যমান রয়েছে, যেখানে দুই বিদেশি নেতা প্রতীকী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তারা হলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ এবং স্পেনের কাতালোনিয়ার উর্গেলের বিশপ। দেশটির সরকারি নাম হলো প্রিন্সিপালিটি অফ অ্যান্ডোরা।

১৯৩৩ সালে প্রথম সংবিধান পাস করে অ্যান্ডোরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সরকারপ্রধান নির্বাহী ক্ষমতা ধারণ করেন; বিচার বিভাগ সংবিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি সংস্থা হিসেবে কাজ করে। দেশটির নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী নেই, সারা দেশে শান্তি ও শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি ছোট পুলিশ বাহিনী রয়েছে।

অ্যান্ডোরার মোট জনসংখ্যার মধ্যে ৯০.৮% খ্রিষ্টান, ৬.৯% ধর্মনিরপেক্ষ, এবং এর পাশাপাশি ২.৩% মুসলমান, হিন্দু ও ইহুদি জনগোষ্ঠী বসবাস করে। সরকারি ভাষা কাতালান, তবে ব্যাবসা-বাণিজ্যে স্প্যানিশ বেশি ব্যবহৃত হয়। এছাড়া, দেশটির অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে পর্যটন শিল্প।

অ্যান্ডোরা বিশ্বে পরিচিত একটি ট্যাক্স হ্যাভেন দেশ, যেখানে শতভাগ আয়কর মুক্ত পরিবেশ বিদ্যমান। দেশের ৮০% জিডিপি পর্যটন খাত থেকে আসে। প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি বিদেশি পর্যটক করমুক্ত শপিং, স্কিইং, হাইকিং ও বিনোদনের জন্য এখানে ভ্রমণ করেন। কৃষি খাতের অবদান ১১.৯%, শিল্প ৩৩.৬%, এবং সেবা খাত ৫৪.৫%।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF, ২০২৬) অনুযায়ী, অ্যান্ডোরার নমিনাল জিডিপি ৪.৭২ বিলিয়ন ডলার, মাথাপিছু আয় প্রায় ৫১,৬৮০ ডলার। প্রবৃদ্ধির হার ১.৬%, বেকারত্বের হার খুবই কম। দেশটিতে শিক্ষার হার ১০০%, এবং ৬–১৬ বছর বয়সি সব শিশুর জন্য বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।

অ্যান্ডোরা আজ একটি শান্তিপ্রিয়, করমুক্ত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত। ক্ষুদ্র আয়তন ও স্বল্প জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি নিরাপদ, আদর্শ, সুশৃঙ্খল ও প্রশংসিত রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে।

লেখা: সিরাজুর রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *