প্রধান খবর

এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার: সাগরের বুকে ভাসমান দূর্গ

এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারকে বলা হয় সাগরের বুকে যেন এক চলমান ভাসমান দূর্গ। এগুলো এখন আর শুধু যুদ্ধজাহাজ নয়, বরং বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর মহাসাগরের বুকে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সারা বিশ্বের প্রায় ১৪টি দেশ বিভিন্ন ধরনের মোট ৫১টি এয়ারক্রাফট ও হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার পরিচালনা করছে।

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে ১১টি নিউক্লিয়ার সুপার এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার, প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৭০–৯০টি এয়ারক্রাফট বহন করা যায়। এছাড়া, তাদের কাছে আরও ৯টি Amphibious Assault Ship বা হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার রয়েছে, যেগুলো থেকে F-35B সিরিজের স্টেলথ ফাইটার জেট পরিচালনা করা যায়।

বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধুনিক ও ব্যয়বহুল ক্যারিয়ার হলো যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি USS Gerald R. Ford ক্লাস সুপার এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার। এর পূর্ণ লোড ডিসপ্লেসমেন্ট প্রায় ১ লক্ষ টন এবং নির্মাণ ব্যয় প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। এটি সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন হয়েছিল, তবে অগ্নিকাণ্ডে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরবর্তীতে সাময়িক মেরামতের জন্য গ্রীসে পাঠানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে চীন বর্তমানে তিনটি কনভেনশনাল হেভি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার পরিচালনা করছে Liaoning, Shandong এবং Fujian। এগুলোর ওজন হতে পারে প্রায় ৬১–৮০ হাজার টন। পাশাপাশি তাদের নৌবাহিনীতে চারটি Amphibious Assault Ship রয়েছে এবং আরও একটি নির্মাণাধীন রয়েছে। তবে তারা এখনো নিউক্লিয়ার শক্তি চালিত ক্যারিয়ার তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।

ইউরোপে ফ্রান্স পরিচালনা করছে একমাত্র নিউক্লিয়ার ক্যারিয়ার Charles de Gaulle, যা ২০০১ সাল থেকে সক্রিয় রয়েছে। বর্তমানে দেশটি ঘোষণা দিয়েছে যে, আগামী ২০৩৮ সালের মধ্যে নতুন প্রজন্মের একটি নিউক্লিয়ার ক্যারিয়ার যুক্ত করবে। এছাড়া ফ্রান্সের কাছে রয়েছে তিনটি মিস্ত্রাল ক্লাস হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার। যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনীতে রয়েছে দুটি আধুনিক ক্যারিয়ার HMS Queen Elizabeth ও HMS Prince of Wales।

ভারতের নৌবাহিনীতে রয়েছে দুটি মিডিয়াম ওয়েট ক্যারিয়ার INS Vikramaditya ও INS Vikrant, যেগুলোর ওজন হবে প্রায় ৪৫ হাজার টন। এগুলো দেশটির মহাসাগর ভিত্তিক সামরিক সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। এদিকে, ইতালি পরিচালনা করছে Cavour ও Giuseppe Garibaldi, আর স্পেনের রয়েছে Juan Carlos নামের একটি লাইট ক্যারিয়ার।

লাতিন আমেরিকার একমাত্র দেশ হিসেবে ব্রাজিল পরিচালনা করছে Atlântico নামের একটি হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার। দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীতে রয়েছে দুটি Amphibious Assault Ship, আর থাইল্যান্ড পরিচালনা করছে HTMS Chakri Naruebet নামের একটি লাইট ক্যারিয়ার।

জাপানের নৌবাহিনী ব্যবহার করছে দুটি হালকা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ও দুটি হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার। বিশেষ করে ইজুমো-শ্রেণির জাহাজগুলোকে সম্প্রতি আপগ্রেড করে F-35B স্টেলথ ফাইটার পরিচালনার উপযোগী করা হয়েছে। মিশর বর্তমানে ফ্রান্স থেকে ক্রয়কৃত দুটি মিস্ত্রাল ক্লাস হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ব্যবহার করছে। অস্ট্রেলিয়ার কাছে রয়েছে দুটি Canberra ক্লাস হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার।

রাশিয়ার নৌবাহিনীর একমাত্র এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার হলো ৬৫ হাজার টন ওজনের Admiral Kuznetsov। তবে দীর্ঘদিন ধরে মেরামতের কারণে বর্তমানে এটি কার্যত অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে তুরস্ক সম্প্রতি TCG Anadolu নামের একটি লাইট ক্যারিয়ার যুক্ত করেছে, যেটিকে তারা ড্রোন অপারেশন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে। এটিই সাগরের বুকে কমব্যাট ড্রোন পরিচালনার প্রথম কোনো ক্যারিয়ার।

সবশেষে বলা যায়, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৪টি দেশ বিভিন্ন ধরনের এয়ারক্রাফট ও হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার পরিচালনা করছে। কিছু সুপার ক্যারিয়ার বৈশ্বিক পর্যায়ে নৌ অভিযান পরিচালনায় সক্ষম, আবার কিছু লাইট ক্যারিয়ার মূলত আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ও সীমিত অপারেশনের জন্য ব্যবহৃত হয়। আর একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এসেও সামরিক শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

লেখা : সিরাজুর রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *