প্রধান খবর

তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল ভুয়া অভিজ্ঞতার অভিযোগ,মুশফিকুর রহমান এমপির পরিবারের সংশ্লিষ্টতা

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তৃতীয় অফশোর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত এখন গুরুতর বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। প্রকল্পটির প্রস্তাবনা, অনুমোদন প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক পরিবারের সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে।

এই অনুসন্ধানমূলক রিপোর্টে অনলাইন উৎস, সরকারি নথি, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে পুরো চিত্র তুলে ধরা হলো।

১. প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি: ৩৭% অতিরিক্ত অর্থ কেন?

বর্তমানে বাংলাদেশ এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ বাবদ দৈনিক ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের জন্য ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার পরিশোধ করে। কিন্তু নতুন তৃতীয় টার্মিনালের জন্য চীনা প্রতিষ্ঠান CNEE দাবি করছে ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার যা আগের দুই টার্মিনালের তুলনায় ৩৫-৩৭% বেশি।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন RPCL ২০২৫ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় সুপারিশ করেছিল ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ ডলার। অর্থাৎ CNEE–র দাবি সমীক্ষার তুলনায় ৪৩% বেশি।এত বেশি ব্যয় কেন স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি কোনো যৌক্তিক সরকারি কমিটি।

২. NS Energy ও CNEE একই নথির দুই কোম্পানি:

অনুসন্ধানে পাওয়া সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ১২ মে NS Energy তৃতীয় টার্মিনালের প্রস্তাব দেয়। ১৯ জুন CNEE একই প্রকল্পের প্রস্তাব দেয়। দুই প্রস্তাবনা পাশাপাশি রেখে দেখা যায় ছয় পৃষ্ঠার নথিতে কোম্পানির নাম ছাড়া একটি শব্দও পরিবর্তন করা হয়নি

CNEE-র জমা দেওয়া ম্যাপেও লেখা ছিল NS Energy, তাদের প্রস্তাবিত এফএসআরইউর নামও ছিল NS Energy FSRU। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, চীনা কোম্পানির নামে প্রকল্পটি জমা দেওয়া হলেও নথির উৎস NS Energy।

৩. NS Energy: মুশফিকুর রহমান এমপির পরিবারের কোম্পানি

NS Energy-র সিইও তারিফ রহমান, মুশফিকুর রহমান এমপির নাতি। তার মা মেহভীন রহমান মুনিয়া এমপির মেয়ে। তার বাবা আশফাক জামিল রহমান কোম্পানির প্রকৃত মালিক হিসেবে স্থানীয় মহলে গুঞ্জন রয়েছে।

অর্থাৎ, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পরিবারের মালিকানাধীন কোম্পানির নথি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেছে, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার জন্য বড় প্রশ্ন।

৪. অভিজ্ঞতা নেই, তবুও প্রকল্প অনুমোদন:

CNEE দাবি করেছে, তারা সামিট টার্মিনাল-২ প্রকল্পে কাজ করেছে। কিন্তু সামিট এলএনজি টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরাসরি বলেছেন:

“CNEE-র সঙ্গে আমাদের কোনো চুক্তি নেই।” অর্থাৎ, যে কোম্পানিকে সরকার তৃতীয় টার্মিনালের কাজ দিতে যাচ্ছে তাদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ তামিম বলেছেন:”আগেরগুলো যদি সস্তা হয়ে থাকে, তাহলে এখন বেশি দামে নতুন একটি কেন নিতে হবে? এর কোনো যৌক্তিকতা নেই।”

৫. সংসদীয় কমিটির জবাবদিহিতা কোথায়?

মুশফিকুর রহমান এমপি অর্থ মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি। অর্থমন্ত্রী তার কমিটির কাছে জবাবদিহি করেন। আবার অর্থমন্ত্রীই অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির আহ্বায়ক, যারা CNEE-র প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে: কমিটির সভাপতির নাতি যদি নামে-বেনামে সরকারি কন্ট্রাক্ট পায়, তাহলে জবাবদিহিতা কোথায়? স্বার্থের সংঘাত কি এখানে স্পষ্ট নয়?সংসদীয় কমিটির গোপন নথি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেল কীভাবে?

 

৬. Hasnat Abdullah- এর ব্যাখ্যা:

MP হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, NS Energy-র কোনো বড় প্রকল্পের অভিজ্ঞতা নেই । CNEE-রও এফএসআরইউ নির্মাণে অভিজ্ঞতা নেই। বড় প্রকল্পে অভিজ্ঞতা ছাড়া প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক। এই পরিবার আগে কখনো এ ধরনের প্রকল্প পরিচালনা করেনি, তাদের সক্ষমতা নেই। তিনি আরও বলেন, এটি স্পষ্ট যে প্রকল্পটি রাজনৈতিক পরিবারের জন্য সুবিধা তৈরির উদ্দেশ্যে সাজানো হয়েছে।

৭. অনলাইন অনুসন্ধানে আরও যা পাওয়া গেছে, NS Energy একটি ছোট স্কেলের কোম্পানি। তাদের ওয়েবসাইটে এলএনজি বা অফশোর প্রকল্পের কোনো রেকর্ড নেই। কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে কোনো প্রকাশ্য তথ্য নেই।

CNEE-র ওয়েবসাইটেও এফএসআরইউ নির্মাণের অভিজ্ঞতা নেই। দুই কোম্পানির নথি একই হওয়া ইঙ্গিত দেয়, প্রকল্পটি আসলে NS Energy-র জন্যই তৈরি হয়েছিল। G2G পদ্ধতি ব্যবহার করে দরপত্র এড়িয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

৮. জনগণের করের অর্থে ব্যক্তিগত লাভ, এটি কি গ্রহণযোগ্য?

বাংলাদেশের কর-নির্ভর অর্থে পরিচালিত জ্বালানি খাত কোনো পরিবারের ব্যক্তিগত লাভের জায়গা হতে পারে না।

এই প্রকল্পে:

অস্বচ্ছতা

স্বার্থের সংঘাত

ভুয়া অভিজ্ঞতার দাবি

নথি কপি করার অভিযোগ

অতিরিক্ত ব্যয়

জবাবদিহিতার অভাব

সব মিলিয়ে এটি একটি গুরুতর কেলেঙ্কারি।

এখনই সময় সঠিক মানুষকে সঠিক প্রকল্পে নিয়োগের। বাংলাদেশ আর কোনো নাটক চায় না। চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, অভিজ্ঞতা, করের অর্থের সঠিক ব্যবহার। এখনই সময় প্রকল্পটি পুনর্মূল্যায়ন করার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *