প্রধান খবর

আইসিইউতে ৯ মাস ও ২১ অস্ত্রোপচার: কৃত্রিম খুলি নিয়ে থমকে আছে শিশু মুসার জীবন

হাতে ছোট্ট একটি খেলনা পিয়ানো। এক হাত দিয়ে টুংটাং সুর তোলার আকুল চেষ্টা করলেও অন্য হাতটি অবশ ও নিশ্চল। নাকে তরল খাবার দেওয়ার নল আর মাথায় কৃত্রিম খুলি-এভাবেই এখন দিন কাটছে সাড়ে আট বছরের শিশু বাসিত খান মুসার। ২০২৪ সালের রক্তঝরা জুলাইয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে শারীরিক ও মানসিক এই চরম যন্ত্রণা বহন করে বেঁচে আছে ছোট্ট মুসা।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আহত হাজারো মানুষের মধ্যে ছিল অনেক শিশু। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ওই আন্দোলনে ১২৮ জন শিশু প্রাণ হারায়। ঘটনার দুই বছর পার হয়ে গেলেও সেই ভয়াবহ সহিংসতার ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে বহু শিশু ও তাদের পরিবার, যার এক জীবন্ত ও করুণ উদাহরণ সাড়ে ছয় বছর বয়সে গুলিবিদ্ধ হওয়া মুসা।

ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। সেদিন রাজধানীর রামপুরার বাসা থেকে বাবার সঙ্গে আইসক্রিম কিনতে নিচে নেমেছিল শিশু মুসা। পেছনে ছিলেন তার দাদি মায়া ইসলাম। তখনই এলাকায় পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের তীব্র সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণ শুরু হয়। গ্যারেজে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ একটি গুলি মুসার মাথার বাম পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। একই গুলিটি পরবর্তীতে তার দাদি মায়া ইসলামের পেটে বিদ্ধ হয়। একদিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান দাদি, কিন্তু মুসাকে আইসিইউতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রেখে দাফনেও যেতে পারেননি তার বাবা।

মুসাকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইটি ছিল দীর্ঘ ও অত্যন্ত কষ্টের। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) এবং পরবর্তীতে সরকারি-বেসরকারি সহায়তায় বিদেশে নিয়েও চালানো হয় চিকিৎসা। দেশ-বিদেশ মিলিয়ে ছোট এই শিশুটির মাথায় মোট ২১টি জটিল অস্ত্রোপচার করা হয়েছে এবং তাকে টানা প্রায় নয় মাস আইসিইউতে থাকতে হয়েছে।

মুসার বাবা মুস্তাফিজুর রহমান জানান, বারবার অস্ত্রোপচারের ফলে মাথার খুলির এক পাশের হাড় আর ব্যবহারযোগ্য ছিল না। বাধ্য হয়ে সেখানে কৃত্রিম খুলি বসানো হয়েছে। বর্তমানে শরীরের ডান দিক পুরোপুরি অবশ থাকায় সে হাঁটতে, কথা বলতে কিংবা চিবিয়ে খেতে পারে না; তাকে সম্পূর্ণ তরল খাবারের ওপর নির্ভর করতে হয়।

দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর মুসা কিছুটা সাড়া দিলেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার লড়াই এখনো অনেক দূর। বিদেশে নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং বিশেষ তরল খাবারের উচ্চ ব্যয় মেটাতে বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে পরিবারটি। তবে এত কষ্টের মাঝেও ছেলের পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার আশা ছাড়েননি তার বাবা-মা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *