প্রধান খবর

পরীমণিকাণ্ডে চাকরি হারাচ্ছেন এডিসি সাকলায়েন

চিত্রনায়িকা পরীমণির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক ও সরকারি বাসভবনে রাত্রিযাপনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) এবং বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. গোলাম সাকলায়েনকে ‘বাধ্যতামূলক অবসরে’ পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গুরুতর অসদাচরণের বিভাগীয় শাস্তি হিসেবে তাঁকে এই গুরুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গোলাম সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর জন্য প্রস্তুতকৃত প্রজ্ঞাপনের সারসংক্ষেপে ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বাক্ষর করেছেন। বিধি অনুযায়ী এই সারসংক্ষেপটি এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পাঠানো হবে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির চূড়ান্ত অনুমোদনের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বাধ্যতামূলক অবসরের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। খুব শিগগিরই এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২১ সালের জুনে সাভারের ঢাকা বোট ক্লাবে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন চিত্রনায়িকা পরীমণি। সেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা গোলাম সাকলায়েন। তদন্তের সূত্র ধরে সাকলায়েনের সরকারি বাসভবনে পরীমণির যাতায়াতের বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। অভিযোগ ওঠার পর পরই সাকলায়েনকে ডিবি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্ত কমিটি সাকলায়েনের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগের সত্যতা পায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের জুনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের শৃঙ্খলা শাখা থেকে সাকলায়েনকে গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরি থেকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর প্রদানের’ বিষয়ে সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) মতামত চাওয়া হয়। পিএসসির আইনি পরামর্শ ও প্রক্রিয়া শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন তাঁর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

পিএসসিতে পাঠানো শৃঙ্খলা শাখার নথির তথ্য অনুযায়ী, ডিবি গুলশান বিভাগে কর্মরত থাকাকালীন পরীমণির সঙ্গে সাকলায়েনের নিয়মিত যোগাযোগ শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় তিনি পরিমণির বাসায় নিয়মিত রাত্রিযাপন করতে থাকেন। পুলিশ অধিদপ্তরের এলআইসি শাখা থেকে সংগৃহীত সাকলায়েনের মুঠোফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২১ সালের ৪ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন সময়ে দিনে ও রাতে পরীমণির বাসায় অবস্থান করেছেন।

এছাড়া সিআইডির ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১ আগস্ট গোলাম সাকলায়েন সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে তাঁর সরকারি কোয়ার্টারের বাসায় স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে পরীমণিকে নিয়ে আসেন। পরীমণি সেখানে প্রায় ১৭ ঘণ্টা অবস্থান করেন এবং পরদিন ২ আগস্ট রাত ১টা ৩০ মিনিটে বাসা ত্যাগ করেন। সাকলায়েন একজন সরকারের দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা, বিবাহিত এবং এক সন্তানের জনক হওয়া সত্ত্বেও সরকারি দায়িত্বের বাইরে গিয়ে চিত্রনায়িকার সাথে বিবাহবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, জন্মদিন উদ্যাপন এবং সরকারি বাসভবনে দীর্ঘ সময় কাটানোর মতো ঘটনা ঘটিয়েছেন। নথিতে উল্লেখ করা হয়, তাঁর এই অপেশাদার আচরণ বাংলাদেশ পুলিশের ঐতিহ্য ও সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।

অভিযুক্ত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা জননিরাপত্তা বিভাগের যুগ্ম সচিবের দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনেও সাকলায়েনের বিরুদ্ধে আনা ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ শতভাগ প্রমাণিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *